আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ভারত
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক একাধিক যৌন সহিংসতার ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিতভাবে (সুয়ো মোটো) নজর দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। পরপর কয়েকটি ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আদালত বলেছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সোমবার বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ দিল্লির সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে দিল্লি পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আলোস্বল্পতা, দুর্বল নজরদারি বা পর্যাপ্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থার অভাবে পার্ক, সড়ক কিংবা বাসের মতো জনপরিসরকে ‘উচ্চঝুঁকির এলাকা’ হয়ে উঠতে দেওয়া যায় না।
আদালত আরও বলেছে, মানুষের মর্যাদার সঙ্গে এবং ভয়মুক্তভাবে বেঁচে থাকার অধিকার মৌলিক অধিকারের অংশ। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপটে ২০১২ সালের নির্ভয়া হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ‘বেদনাদায়ক মিল’ দেখতে হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছে বেঞ্চ।
দুই সপ্তাহে চারটি ঘটনা
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের পেছনে রয়েছে দিল্লিতে গত দুই সপ্তাহে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জড়িত চারটি যৌন নির্যাতনের ঘটনা।
এর মধ্যে ১০ সেপ্টেম্বর উত্তর-পশ্চিম দিল্লির স্বরূপ নগরে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ ওঠে। পুলিশ এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
১৭ সেপ্টেম্বর সদর বাজার এলাকায় ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে দোকানে আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগে এক দর্জিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এরপর ২১ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ দিল্লির কালকাজি এলাকার আস্থা কুঞ্জ পার্কে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীকে তিন ব্যক্তি পুলিশ পরিচয় দিয়ে ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। ওই মামলায় তিন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে পার্কটির আলো, প্রবেশপথ ও নজরদারির বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া ১৪ সেপ্টেম্বর মধ্য দিল্লির দেশবন্ধু গুপ্ত রোড এলাকায় ছয় বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রশ্ন
সুপ্রিম কোর্ট বিশেষভাবে জনপরিসরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে নজর দিয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে পার্ক, সড়ক, বাস, মেট্রো স্টেশন ও সাবওয়ের মতো স্থানগুলোতে পর্যাপ্ত আলো, পুলিশি টহল ও নজরদারি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
কালকাজির আস্থা কুঞ্জ পার্কের ঘটনায় পুলিশও জানিয়েছে, পার্কের কিছু অংশে আলো কম, কয়েকটি প্রবেশপথে নিরাপত্তাকর্মী ছিল না এবং দেয়ালের কিছু অংশ ভাঙা ছিল। এসব অবকাঠামোগত দুর্বলতা তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
‘উদ্বেগ প্রকাশ’ নয়, কার্যকর ব্যবস্থা চায় আদালত
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশকে যথেষ্ট মনে করেনি সুপ্রিম কোর্ট। আদালত বলেছে, শুধু সহমর্মিতা প্রকাশের পরিবর্তে পরিমাপযোগ্য পদক্ষেপ ও সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আদালতের এই পর্যবেক্ষণের পর দিল্লি পুলিশ ও প্রশাসনের কাছ থেকে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর তদন্ত, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে জবাবদিহির বিষয়টি সামনে এসেছে।
নির্ভয়া-পরবর্তী প্রশ্ন আবারও সামনে
২০১২ সালের দিল্লির নির্ভয়া মামলার পর ভারতে যৌন অপরাধ সংক্রান্ত আইনে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছিল। একই সঙ্গে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল।
এক যুগেরও বেশি সময় পর রাজধানীতে একাধিক অপ্রাপ্তবয়স্কের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের নতুন করে কঠোর পর্যবেক্ষণ সেই পুরোনো প্রশ্নকেই সামনে এনেছে—আইন ও নীতিমালার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর।

0 Comments