রাজনীতি ডেস্কঃ
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ বিভাজন, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, বহিষ্কৃত নেতাকর্মীদের দলে ফেরার চেষ্টা এবং আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে নতুন করে সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশের দাবি, উপজেলা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো ও কার্যক্রমের ঘাটতি থাকায় নেতৃত্বের প্রশ্নে একাধিক বলয় তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে দলটির বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে কর্মসূচি, নেতৃত্ব এবং সম্ভাব্য নির্বাচনী প্রার্থী বাছাই নিয়ে মতবিরোধও প্রকাশ্যে এসেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পৃথক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনাও সেই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনকে সামনে এনেছে। ২৩ সেপ্টেম্বর কালিগঞ্জে বিএনপির দুই পক্ষের পৃথক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উভয় পক্ষকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
নেতৃত্বের বিভাজন নিয়ে আলোচনা
স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী আলাউদ্দিন এবং জেলা বিএনপির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আইয়ুব হোসেন মুকুলকে ঘিরে পৃথক রাজনৈতিক বলয় তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
একসময় তারা একই রাজনৈতিক বলয়ে সক্রিয় থাকলেও বর্তমানে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশের বক্তব্য।
এর পাশাপাশি দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে পূর্বে বহিষ্কৃত ডা. শহিদুল আলম ও তার অনুসারীদের একটি অংশ আবার বিএনপির মূলধারায় ফেরার প্রত্যাশায় রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বহিষ্কৃতদের ফেরার আকাঙ্ক্ষা
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার অভিযোগে কালিগঞ্জের বিভিন্ন পর্যায়ের বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী বহিষ্কৃত হন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে অনেকেই বর্তমানে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের প্রত্যাশা করছেন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন তারা।
তবে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার বা কাউকে পুনরায় সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি দলীয় সিদ্ধান্ত ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
নির্বাচনী প্রার্থী বাছাইয়ে নতুন উত্তাপ
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে কালিগঞ্জ বিএনপির অভ্যন্তরীণ সমীকরণ আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, দলীয় পর্যায়ে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা বা চূড়ান্ত মনোনয়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই বিভিন্ন ইউনিয়নে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে সভা-সমাবেশ ও প্রচারণা চলছে। এ নিয়ে দলের অন্য অংশের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করছে, প্রতিটি ইউনিয়নে একক প্রার্থী নির্ধারণ করতে না পারলে অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা নির্বাচনী মাঠে প্রভাব ফেলতে পারে।
কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ
২৩ সেপ্টেম্বর কালিগঞ্জে বিএনপির দুটি পৃথক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক পক্ষের কর্মসূচি ছিল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এবং অন্য পক্ষও পৃথক কর্মসূচি পালন করছিল। পরে মিছিল দুটি কাছাকাছি এলে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে।
উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে প্রথম হামলার অভিযোগ করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে গিয়ে উভয় পক্ষকে সরিয়ে দেওয়া হয়। আহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
এই ঘটনার পর জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট নেতাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অতীতের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
কালিগঞ্জ বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আরেকটি বিতর্ক হলো—বিগত সরকারের সময়ে কারা বিএনপির সঙ্গে ছিলেন এবং কারা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর অভিযোগ, অতীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত বা সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কিছু ব্যক্তি পরবর্তীতে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে এসেছেন।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে যেসব প্রমাণের কথা স্থানীয় নেতারা বলছেন, সেগুলো প্রকাশ্যে যাচাই বা বিচারিকভাবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন: বড় পরীক্ষা
কালিগঞ্জ উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে একক প্রার্থী নির্বাচন।
দলীয় প্রতীক না থাকায় স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচন আরও জটিল হতে পারে। একই রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতা স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ভোট বিভাজনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, উপজেলার ১২টি ইউনিয়নেই সম্ভাব্য প্রার্থী ও স্থানীয় গ্রুপিং নিয়ে আলোচনা চলছে। দলীয় সিদ্ধান্তে কোনো নেতা মনোনয়ন না পেলে তিনি স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তির তৎপরতা
বিএনপির অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থী ও সাংগঠনিক তৎপরতাও নির্বাচনী সমীকরণে ভূমিকা রাখতে পারে।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী কাজী আলাউদ্দীন, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. শহিদুল আলম এবং জামায়াতের হাফেজ মুহা. রবিউল বাশারসহ একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
ফলে জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় পর্যায়ের গ্রুপিং—দুটিই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আগে দলগুলোর কৌশল নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।

0 Comments