বাংলাদেশের মূল রেল নেটওয়ার্কে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ এবার বাস্তব প্রকল্পের দিকে এগোচ্ছে। প্রথম ধাপে নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা–জয়দেবপুর প্রায় ৫২.৩২ কিলোমিটার করিডোরে ১৬ সেট Electric Multiple Unit (EMU) কমিউটার ট্রেন চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের মূল রেলপথে বিদ্যুৎচালিত কমিউটার ট্রেন চলাচলের নতুন অধ্যায় শুরু হবে।
বর্তমান প্রস্তাব অনুযায়ী, রেললাইনের ওপর Overhead Catenary System (OCS) স্থাপন করে ট্রেনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। ৫২.৩২ কিলোমিটার রেলপথ হলেও উভয় দিকের লাইন, ইয়ার্ড ও সংশ্লিষ্ট ট্র্যাক মিলিয়ে প্রায় ১৮৬ ট্র্যাক-কিলোমিটার এলাকায় ওভারহেড বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দুটি ট্র্যাকশন সাবস্টেশন ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছে।
১৬ সেট EMU কমিউটার ট্রেন
প্রকল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো ১৬ সেট বৈদ্যুতিক কমিউটার ট্রেন বা EMU সংগ্রহ। EMU ট্রেনে আলাদা ইঞ্জিনের পরিবর্তে ট্রেনের একাধিক কোচেই বৈদ্যুতিক মোটর ও প্রয়োজনীয় ট্র্যাকশন সরঞ্জাম থাকে। ফলে ঘনঘন থামা-চলার কমিউটার সার্ভিসে দ্রুত গতি তোলা ও কম সময়ে স্টেশন ছাড়ার সুবিধা পাওয়া যায়।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৬ সেট EMU ট্রেন সংগ্রহে প্রায় ১,৯৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রেনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জয়দেবপুর এলাকায় একটি বিশেষায়িত EMU ওয়ার্কশপ নির্মাণের কথাও রয়েছে।
প্রকল্প ব্যয় কত?
২০২৬ সালের সর্বশেষ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (DPP) অনুযায়ী প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ৪,২৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে এডিবি (ADB) ও ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (EIB) থেকে সম্মিলিতভাবে প্রায় ২,৮৩১ কোটি টাকা ঋণ পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। বাকি প্রায় ১,৪৫২ কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন থেকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ঋণের সুদের হার ও পরিশোধের শর্ত পরবর্তী আলোচনায় নির্ধারিত হওয়ার কথা।
প্রকল্পের ব্যয়ের মধ্যে ওভারহেড ক্যাটেনারি, দুটি সাবস্টেশন ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার জন্য প্রায় ৮৩৫ কোটি টাকা, ১৬ সেট EMU কেনার জন্য প্রায় ১,৯৫৭ কোটি টাকা এবং EMU ওয়ার্কশপ নির্মাণের জন্য প্রায় ৬৮৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।
কখন হতে পারে বাস্তবায়ন?
বর্তমান DPP অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়কাল জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৬ পর্যন্ত প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে নির্মাণকাজের জন্য চার বছর, ত্রুটি সংশোধনের জন্য এক বছর এবং পরবর্তী পাঁচ বছর রক্ষণাবেক্ষণের সময় রাখা হয়েছে। প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়িত হয়ে যায়নি; অনুমোদন, অর্থায়ন ও অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর নির্মাণকাজ এগোবে।
কেন প্রথমে নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা–জয়দেবপুর?
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর বাংলাদেশের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যস্ত নগর-অঞ্চল। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ এই করিডোরে যাতায়াত করেন। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা এবং ঢাকা–জয়দেবপুর পথে বিদ্যমান কমিউটার ট্রেন সেবা রয়েছে। নতুন বৈদ্যুতিক কমিউটার ব্যবস্থা এই বিদ্যমান করিডোরকে আরও আধুনিক ও দ্রুতগামী করার লক্ষ্যেই প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালু হলে যাতায়াতের সময় প্রায় ১৮ শতাংশ কমতে পারে এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় ৩৫ শতাংশ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে ডিজেলচালিত ট্রেনের ওপর নির্ভরতা কমলে নির্গমনও কমতে পারে।
১২০ কিলোমিটার গতির পরিকল্পনা
বৃহত্তর বৈদ্যুতিক রেল পরিকল্পনার সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ট্রেনের প্রাথমিক সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ১২০ কিলোমিটার রাখার কথা বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে অবকাঠামো ও পরিচালনব্যবস্থা উপযোগী হলে গতি আরও বাড়ানোর সুযোগ রাখার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সর্বোচ্চ গতি আর বাস্তব যাত্রার গড় গতি এক বিষয় নয়। স্টেশনের সংখ্যা, সিগন্যালিং, লেভেল ক্রসিং, ট্রাফিক, স্টপেজ এবং বিদ্যমান লাইনের সক্ষমতার ওপর প্রকৃত যাত্রার সময় নির্ভর করবে।
শুধু ৫২ কিলোমিটারেই থেমে থাকবে না
নারায়ণগঞ্জ–জয়দেবপুর অংশটি মূলত প্রথম ধাপ। বাংলাদেশ রেলওয়ের বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন নিয়ে করা সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা–চট্টগ্রাম এবং টঙ্গী–জয়দেবপুর মিলিয়ে মোট ৩৪৮.১৬ কিলোমিটার রেলপথ ও ৭০টি স্টেশনকে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশনের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের নথি অনুযায়ী, এই বড় প্রকল্পে EMU ওয়ার্কশপ, বৈদ্যুতিক লোকোমোটিভ ওয়ার্কশপ এবং বিভিন্ন স্থানে শেড ও অন্যান্য অবকাঠামোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
পরবর্তী ধাপে টঙ্গী থেকে চট্টগ্রামমুখী অংশে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ADB ও EIB-এর অর্থায়ন
বাংলাদেশের বৈদ্যুতিক রেল প্রকল্পে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের আগ্রহ রয়েছে। এডিবি আগে নারায়ণগঞ্জ–জয়দেবপুর বৈদ্যুতিক রেল প্রকল্পে অর্থায়নের আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। পরবর্তী পর্যায়ে ADB ও EIB-এর সম্মিলিত ঋণ সহায়তার বিষয়টি বর্তমান DPP-তেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অর্থায়নের সম্মতি বা প্রস্তাব এবং অর্থ ছাড় এক বিষয় নয়। চূড়ান্ত ঋণচুক্তি, শর্ত, প্রকল্প অনুমোদন ও পরবর্তী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই অর্থায়ন কার্যকর হবে।
পরিবেশ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সম্ভাবনা
বৈদ্যুতিক ট্রেনের অন্যতম সুবিধা হলো সরাসরি ডিজেল জ্বালানি ব্যবহারের প্রয়োজন কমে যাওয়া। ফলে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা, পরিচালন ব্যয় এবং রেল চলাচল থেকে নির্গমন কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের সম্ভাব্যতা সমীক্ষাতেও বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশনকে তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
MRT-এর বিকল্প হিসেবে সম্ভাবনা
ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ করিডোরে বৈদ্যুতিক কমিউটার ট্রেন চালু হলে এটি ভবিষ্যৎ নগর পরিবহন পরিকল্পনাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জ–জয়দেবপুর বৈদ্যুতিক কমিউটার প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয়কে প্রস্তাবিত MRT Line-4-এর তুলনায় অনেক কম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। তবে কোন প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে, তা সংশ্লিষ্ট সরকারি সিদ্ধান্ত ও অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বৈদ্যুতিক রেল চালু করতে শুধু রেললাইনের ওপর তার বসালেই হবে না। প্রয়োজন হবে—
OCS ও বিদ্যুৎ সাবস্টেশন নির্মাণ
নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ
১৬ সেট EMU সংগ্রহ
আধুনিক সিগন্যালিং ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা
জয়দেবপুরে EMU রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো
প্রশিক্ষিত জনবল
নিরাপত্তা ও জরুরি ব্যবস্থাপনা
অর্থায়ন ও প্রকল্প অনুমোদন
বিদ্যমান ট্রেন চলাচলের সঙ্গে নতুন বৈদ্যুতিক ট্রেনের সমন্বয়
বাংলাদেশ রেলওয়ের ২০২৩ সালের সম্ভাব্যতা ও বিস্তারিত নকশা কার্যক্রমের আওতায় ৩৪৮.১৬ কিলোমিটার রেলপথ নিয়ে কাজ করা হয়েছে এবং এর জন্য তুরস্কভিত্তিক TUMAS-এর সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল।
বাংলাদেশের রেলে নতুন যুগের সম্ভাবনা
নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা–জয়দেবপুর অংশে ১৬ সেট EMU কমিউটার ট্রেন চালুর পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের মূল রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্রেনের প্রথম বড় ব্যবহারিক পদক্ষেপ হবে।
পরবর্তী সময়ে এই ব্যবস্থা চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রেল করিডোরে সম্প্রসারিত করা গেলে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। দ্রুততর যাতায়াত, জ্বালানি সাশ্রয়, কম পরিচালন ব্যয় এবং পরিবেশগত সুবিধার পাশাপাশি ঢাকা ও আশপাশের শহরগুলোর গণপরিবহন ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

0 Comments