Header Ads Widget

Responsive Advertisement

মোবাইলে ঋণের আবেদন করলেই বিপদ! ৬ হাজার টাকায় শোধ করতে হয় ১০ হাজার, হাতছাড়া হচ্ছে ব্যক্তিগত তথ্য



অনলাইন ডেস্ক

জরুরি টাকার প্রয়োজন। হাতে নগদ নেই। এমন পরিস্থিতিতে ফেসবুক বা মোবাইলের বিজ্ঞাপনে চোখে পড়ল—‘সহজে ঋণ’, ‘কোনো জামানত লাগবে না’, ‘মিনিটেই টাকা’। প্রয়োজনের তাগিদে অনেকেই এসব অ্যাপ ডাউনলোড করে ঋণের আবেদন করছেন। কিন্তু দ্রুত পাওয়া এই টাকা অনেকের জন্য পরিণত হচ্ছে ভয়ংকর ফাঁদে।

ঋণের নামে অতিরিক্ত টাকা আদায়, ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া এবং টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে ফোনে হুমকি—এমন অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন অননুমোদিত ঋণদাতা অ্যাপের বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি এমন একটি ঘটনায় একজন বেসরকারি চাকরিজীবী মাত্র ৬ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে প্রায় ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন। ঋণের মেয়াদ ছিল প্রায় এক মাস। অর্থাৎ মূল টাকার তুলনায় বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়েছে তাঁকে।

ঋণ নিতে গিয়ে চলে যাচ্ছে ফোনের ব্যক্তিগত তথ্য

এসব অ্যাপের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—ঋণের আবেদন করার সময় ব্যবহারকারীর মুঠোফোনের বিভিন্ন তথ্যের অনুমতি চাওয়া।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক অ্যাপ ফোনবুক, ছবি, ভিডিও, খুদে বার্তা ও অবস্থানের তথ্য ব্যবহারের অনুমতি চায়। পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি এবং বিকাশ বা নগদের মতো আর্থিক সেবার নম্বরও চাওয়া হয়।

অর্থাৎ কয়েক হাজার টাকা ঋণের আশায় আবেদন করতে গিয়ে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য চলে যেতে পারে অপরিচিত ব্যক্তিদের হাতে।

২৪ হাজার টাকা ঋণ, এক সপ্তাহেই বকেয়া ৮১ হাজার!

মিরপুরের বাসিন্দা সাঈদ মিয়ার অভিজ্ঞতাও ভয়াবহ। তিনি জরুরি প্রয়োজনে একটি অ্যাপের মাধ্যমে ২৪ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র এক সপ্তাহ পর অ্যাপেই সুদসহ তাঁর বকেয়া দেখানো হয় ৮১ হাজার টাকা।

সাঈদের অভিযোগ, তিনি এর মধ্যে ৫৪ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। এরপরও বাকি টাকা নিয়ে চাপ দেওয়া হয়। এমনকি পরিচিত ব্যক্তিদের ফোন করা ও ভয়ভীতি দেখানোর হুমকিও দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে চলছে অন্তত ৩০টি অননুমোদিত ঋণ অ্যাপ

তথ্য অনুসন্ধানে বাংলাদেশে ঋণ কার্যক্রম চালানো অন্তত ৩০টি অ্যাপের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব অ্যাপের অনেকগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে গ্রাহক আকৃষ্ট করছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া অ্যাপগুলোর মধ্যে রয়েছে—ফিনক্যাশ, কুইক লোন, কুইক টাকা, পপক্যাশ, লোনভাইব, দোস্ত লোন, ক্যাশহোরা, ফাস্ট লোন, ইজি টাকা, বঙ্গক্যাশ, স্মার্ট লোন বিডি, অনলাইন লোন বিডিসহ আরও কয়েকটি অ্যাপ।

কিছু অ্যাপ আবার পরিচিত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের নাম বা কাছাকাছি নাম ব্যবহার করে গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

টাকা না দিলেই শুরু হয় হয়রানি?

অভিযোগ অনুযায়ী, ঋণের টাকা ফেরত দিতে দেরি হলে বা দাবিকৃত অতিরিক্ত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গ্রাহকদের ফোনে হুমকি দেওয়া হয়। কারও আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিত ব্যক্তিদের ফোন করার ভয় দেখানো হয়। এমনকি ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য প্রকাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সামাজিক নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বৈধ ঋণ আর অননুমোদিত অ্যাপ—পার্থক্য বুঝুন

বাংলাদেশে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অনুমোদিত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে ঋণ দিতে পারে। কিন্তু অনুমোদনহীন কোনো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ বৈধ নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, অ্যাপে অবৈধ ঋণ দেওয়ার বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। তবে ডিজিটাল ঋণ অ্যাপের প্রতারণা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

ঋণ নেওয়ার আগে যে বিষয়গুলো অবশ্যই দেখবেন

অনলাইনে ঋণের আবেদন করার আগে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি—

  • অ্যাপটি কোন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে তা যাচাই করুন।

  • বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির বৈধ অনুমোদন আছে কি না দেখুন।

  • অস্বাভাবিক বেশি সুদের প্রস্তাব এড়িয়ে চলুন।

  • ফোনবুক, ছবি, ভিডিও বা খুদে বার্তার অপ্রয়োজনীয় অনুমতি দেবেন না।

  • জাতীয় পরিচয়পত্র ও আর্থিক তথ্য অপরিচিত অ্যাপে দেওয়ার আগে যাচাই করুন।

  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখেই ঋণের আবেদন করবেন না।

  • কোনো অ্যাপ ঋণের বিনিময়ে ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিলে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে জানান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রতারণা বড় আকার ধারণ করার আগেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। পাশাপাশি সাধারণ ব্যবহারকারীদেরও ডিজিটাল ঋণের নামে প্রতারণার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

Post a Comment

0 Comments