Header Ads Widget

Responsive Advertisement

ভিয়েতনামের সাফল্য থেকে বাংলাদেশের জন্য বড় শিক্ষা

 

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম—দুই দেশই কয়েক দশক আগে অর্থনৈতিকভাবে অনেকটা কাছাকাছি অবস্থানে ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ভিয়েতনাম শিল্প ও রপ্তানি খাতে যে অগ্রগতি করেছে, বাংলাদেশ সেই গতিতে এগোতে পারেনি। বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তিপণ্য রপ্তানিতে দুই দেশের ব্যবধান এখন স্পষ্ট।

বিশ্লেষকদের মতে, ভিয়েতনামের অগ্রগতির পেছনে কোনো একটি সিদ্ধান্ত নয়; বরং দক্ষ জনশক্তি তৈরি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হওয়া এবং শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির সমন্বিত উদ্যোগ কাজ করেছে।

দক্ষ জনশক্তিই শিল্পায়নের অন্যতম ভিত্তি

প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প গড়ে তুলতে শুধু শিক্ষিত মানুষ যথেষ্ট নয়। কর্মীদের দ্রুত নতুন প্রযুক্তি শেখা, সমস্যা সমাধান, দলগতভাবে কাজ করা এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতাও প্রয়োজন।

ভিয়েতনাম শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, যেখানে নতুন শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মীদের দক্ষতা বিকশিত হচ্ছে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর উপস্থিতিও স্থানীয় প্রকৌশলী ও কর্মীদের জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই বড় শিক্ষা—শুধু ডিগ্রিধারী কর্মী নয়, শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী শেখার সক্ষমতাসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে।

বিশ্ববাণিজ্যের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো জরুরি

আধুনিক ইলেকট্রনিক পণ্য একটি দেশের একক উৎপাদনের ফল নয়। বিভিন্ন দেশের কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তি ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মিলেই একটি পণ্য তৈরি হয়।

ভিয়েতনাম ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছে। বিভিন্ন বাণিজ্যচুক্তি ও বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের ফলে দেশটির শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক মান, প্রতিযোগিতা এবং সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়াতে হলে বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্কে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগ শুধু অর্থ নয়

ভিয়েতনামের শিল্পায়নে বিদেশি বিনিয়োগ বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ দেশটির উৎপাদন সক্ষমতা ও রপ্তানি বাড়িয়েছে।

বিদেশি কোম্পানি একটি দেশে শুধু মূলধন নিয়ে আসে না। এর সঙ্গে আসে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, মান নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নতুন ধরনের কর্মসংস্থান।

বড় কোম্পানির চারপাশে আবার স্থানীয় সরবরাহকারী, পরিবহন, ব্যাংকিং, প্রশিক্ষণ ও সেবা খাতের বিকাশ ঘটে। ফলে একটি বড় বিনিয়োগ ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প-ইকোসিস্টেম তৈরি করতে পারে।

শিল্পের জন্য জমি ও অবকাঠামো দরকার

বড় প্রযুক্তি কারখানা স্থাপনের জন্য শুধু একটি ভবন বা জমি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বিদ্যুৎ, পানি, যোগাযোগব্যবস্থা, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং দ্রুত পণ্য পরিবহনের সুবিধা।

একটি বড় ইলেকট্রনিকস কারখানার সঙ্গে অসংখ্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী যুক্ত থাকে। তাই শিল্পাঞ্চল পরিকল্পনার সময় মূল কারখানার পাশাপাশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও পর্যাপ্ত জায়গা ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের সামনে সুযোগ এখনো আছে

ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—অর্থনৈতিক রূপান্তর কোনো একক নীতির মাধ্যমে সম্ভব নয়।

দক্ষ জনশক্তি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সংযোগ, শিল্প অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা—সবগুলোকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।

বাংলাদেশ যদি ইলেকট্রনিকস, প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, অটোমোবাইলসহ নতুন শিল্প খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে, তাহলে রপ্তানি আয়ের নতুন উৎস তৈরি হতে পারে এবং তরুণদের জন্য উচ্চ দক্ষতার কর্মসংস্থানও বাড়বে।

ভিয়েতনামের সাফল্য তাই শুধু একটি দেশের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শিক্ষা। সুযোগ তৈরি হলেই হবে না—সুযোগ গ্রহণের মতো প্রস্তুতিও থাকতে হবে।

Post a Comment

0 Comments