সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে-স্কেলে মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড কাঠামো বহাল রেখে নতুন বেতন কাঠামো দুই ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম বছরে মূল বেতন এবং দ্বিতীয় বছরে বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বেতন বৃদ্ধির চূড়ান্ত হার, বাস্তবায়নের সময়সূচি এবং ভাতার কাঠামো নির্ধারণে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে।
বেতন কতটা বাড়তে পারে?
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের আগের সুপারিশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব ছিল। সেখানে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ তৈরির জন্য গঠিত সচিব কমিটি মূল বেতন বৃদ্ধির সর্বোচ্চ হার ১০০ শতাংশ পর্যন্ত রাখার প্রস্তাব করেছে। কমিটির সব সদস্য চূড়ান্ত প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছেন।
বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির অন্যতম প্রত্যাশিত উদ্দেশ্য হলো জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়কে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি নতুন বেতন কাঠামোর আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে শুধু বেতন বাড়ালেই সরকারি সেবায় দুর্নীতি, ঘুষ বা অনিয়ম পুরোপুরি বন্ধ হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি কঠোর জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, সম্পদের হিসাব যাচাই, ঘুষবিরোধী নজরদারি এবং দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন বেতন কাঠামোতে সমন্বয় না হওয়া এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তবে একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—বেতন বাড়ানোর পর সরকারি সেবায় ঘুষ ও অনিয়ম কমেছে কি না, সেটি কীভাবে পরিমাপ করা হবে? এজন্য বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, নাগরিক সেবা পর্যবেক্ষণ এবং দুর্নীতির অভিযোগের দ্রুত তদন্তের মতো ব্যবস্থা কার্যকর করা প্রয়োজন।
সরকারি ব্যয়ে বড় বরাদ্দ
২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ সংশ্লিষ্ট খাতে মোট বরাদ্দ ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।
এত বড় সরকারি ব্যয়ের বিপরীতে জনগণের প্রত্যাশাও বেশি। বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি অফিসে সেবার মান উন্নত হওয়া, হয়রানি কমা এবং ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া—এসব বিষয়ও নিশ্চিত করতে হবে।
১১ বছর পর পরিবর্তনের উদ্যোগ
প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একই বেতন কাঠামোর আওতায় রয়েছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের বেতন কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসবে।
তবে নতুন বেতন কাঠামোর সফলতা শুধু কত শতাংশ বেতন বাড়ল, তার ওপর নির্ভর করবে না। বেতন বৃদ্ধি + কর্মদক্ষতা + জবাবদিহিতা + দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ—এই চারটি বিষয় একসঙ্গে কার্যকর করা গেলে সরকারি সেবার মান ও জনগণের আস্থা আরও বাড়তে পারে।

0 Comments