দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, চাইলেই একদিনের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো বা শিল্পে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এসব সংকট কাটাতে সময় লাগবে।
প্রথম আলোর সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে দেশের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, ব্যাংক খাত, বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি, আইএমএফ ঋণ, রাজস্ব আদায় ও নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।
অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি, তবে চ্যালেঞ্জও আছে
অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও লেনদেনের ভারসাম্যে উন্নতি হয়েছে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহ অব্যাহত রয়েছে এবং ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরছে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৫ ফেব্রুয়ারি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার। ১৩ আগস্ট তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারে।
তবে অর্থনীতির সব সূচকে স্বস্তি আসেনি বলেও স্বীকার করেন তিনি। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ, ঋণপ্রবৃদ্ধি এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
‘গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যা কাটাতে সময় লাগবে’
শিল্প উৎপাদনের কাঙ্ক্ষিত গতি না আসার পেছনে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন আমির খসরু।
তাঁর বক্তব্য, একদিনের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো কিংবা প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব নয়। উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে সময় প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাসসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব দেশের উৎপাদন ও অর্থনীতিতেও পড়েছে।
বিনিয়োগ কেন এখনো ধীর?
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণের প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি—এটি সরকারের অন্যতম উদ্বেগ বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
তাঁর মতে, আগের কয়েক বছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে সময় প্রয়োজন। সরকার ব্যবসার খরচ কমানো, নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা এবং শেয়ারবাজারকে বৃহৎ অর্থায়নের উৎস হিসেবে গড়ে তোলার দিকে নজর দিচ্ছে।
তিনি জানান, সরাসরি তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করা হচ্ছে এবং নতুন কয়েকটি কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
ব্যাংকে রাখা টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস
পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগের ফলে আমানতকারীদের অর্থ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আমানতকারী ছোট না বড়—এভাবে আলাদা করা হবে না। ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের আস্থা ধরে রাখতে আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তবে পুরো প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে সময় লাগতে পারে বলেও জানান তিনি।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ কত?
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের বিষয়েও কথা বলেন আমির খসরু। তাঁর দাবি, এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকার মতো পাচার অর্থ শনাক্ত করা হয়েছে।
তবে এসব অর্থ দ্রুত দেশে ফেরত আনা সহজ নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিভিন্ন দেশের আইন ও প্রক্রিয়ার কারণে অর্থ উদ্ধারে সময় লাগছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
মূল্যস্ফীতি কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ
অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেন, মূল্যস্ফীতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। জুলাইয়ে কিছুটা কমলেও আরও কমানো প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
সরকারের লক্ষ্য একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো। ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা গেলে অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তাঁর আশা।
আইএমএফের সঙ্গে নতুন কর্মসূচি
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়েও কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি জানান, আগের কর্মসূচি থেকে সরকার সরে এসেছে এবং নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। তবে জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সংস্কার ও শর্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার নিজস্ব অগ্রাধিকার ও সময়ক্রম অনুসরণ করতে চায়।
অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য, দেশের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।
নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে কী বললেন?
সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামোর অর্থায়ন নিয়েও প্রশ্ন করা হয় অর্থমন্ত্রীকে।
তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে হিসাব-নিকাশ চলছে। রাজস্ব পরিস্থিতি ও সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করে কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে। একসঙ্গে পুরো অর্থের সংস্থান করা সম্ভব কি না, সেটিও বিবেচনায় রয়েছে।
অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে কত সময়?
অর্থমন্ত্রী মনে করেন, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক দুর্বলতা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে অর্থনীতিকে ভঙ্গুর অবস্থা থেকে স্থিতিশীল পর্যায়ে নিতে হবে। এরপর ধাপে ধাপে সমৃদ্ধির দিকে এগোতে হবে।
তিনি দুই বছর ও চার বছরের সময়সীমার কথা উল্লেখ করে বলেন, অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পর্যায়ক্রমে কাজ করতে হবে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে মূল ৭ বিষয়
১. গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট: দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়, সময় লাগবে।
২. মূল্যস্ফীতি: কিছুটা কমলেও এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
৩. বিনিয়োগ: বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশার তুলনায় কম।
৪. ব্যাংক খাত: আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার।
৫. পাচার অর্থ: ৭০–৮০ হাজার কোটি টাকা শনাক্তের দাবি।
৬. আইএমএফ: নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে।
৭. অর্থনীতি: স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধিতে ফিরতে সময় প্রয়োজন।

0 Comments