কৃষিকাজে আগাছা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত রাসায়নিক প্যারাকোয়াট নিয়ে বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেশের ১০টি হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করে করা একটি গবেষণায় ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ১,৪২০টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের বিষক্রিয়া ও মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গবেষণাটি American Society of Tropical Medicine and Hygiene-এর সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা অংশ নেন। গবেষকদের মতে, প্যারাকোয়াটের সহজলভ্যতা এবং কৃষিক্ষেত্রে এর ব্যাপক ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
আমদানি বেড়েছে ব্যাপকভাবে
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ৫৩ টনের কিছু বেশি প্যারাকোয়াট আমদানি হয়েছিল। ২০২৩ সালে সেই পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৪ হাজার ৬৯৫ টনে পৌঁছায়।
কৃষি–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কৃষিশ্রমিকের সংকট ও শ্রমের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক কৃষক হাতে আগাছা পরিষ্কারের পরিবর্তে রাসায়নিক আগাছানাশকের ওপর বেশি নির্ভর করছেন। ফলে কৃষিক্ষেত্রে প্যারাকোয়াটের ব্যবহারও বিস্তৃত হয়েছে।
২০২৪ সালে বেড়েছে বিষক্রিয়ার ঘটনা
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ৪৯৩টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আক্রান্তদের বড় একটি অংশ তরুণ। গবেষণায় ১২ থেকে ৩০ বছর বয়সী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ ছিল ৭৮ শতাংশের বেশি। শিক্ষার্থী ও গৃহিণীদের মধ্যেও আক্রান্তের উল্লেখযোগ্য হার পাওয়া গেছে।
গবেষকেরা বলছেন, প্যারাকোয়াট শরীরে প্রবেশ করলে গুরুতর অঙ্গহানি ঘটতে পারে এবং এর বিষক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। বর্তমানে এর নির্দিষ্ট কোনো নিশ্চিত প্রতিষেধক নেই—এ কারণে বিষক্রিয়ার পর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাও কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্বের অনেক দেশে নিষিদ্ধ
জনস্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কয়েকটি দেশে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি কোথাও কোথাও এর ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ করার পর কীটনাশক-সম্পর্কিত আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল—এমন তথ্যও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। ফলে কীটনাশকের সহজপ্রাপ্যতা নিয়ন্ত্রণ আত্মহত্যা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন।
বাংলাদেশে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে পর্যালোচনা
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে প্যারাকোয়াটসহ ক্ষতিকর কৃষি রাসায়নিকের ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য একটি কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছে। গবেষণা ও পর্যালোচনার ফলাফলের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যারাকোয়াটের পরিবর্তে আগাছা নিয়ন্ত্রণের সমন্বিত পদ্ধতি, যান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত না করেই ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য ও কৃষি—দুই দিকেই নজর প্রয়োজন
প্যারাকোয়াট নিয়ে বিতর্কের মূল বিষয় শুধু কৃষিতে এর কার্যকারিতা নয়; বরং কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এর আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রি ও ব্যবহারের ওপর কার্যকর নজরদারির পাশাপাশি কৃষকদের নিরাপদ বিকল্প সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা এবং জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা—দুই বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়া নিয়ে প্রকাশিত গবেষণা, সরকারি আমদানি-সংক্রান্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য।

0 Comments