সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যেই মন্ত্রিসভার আকার আরও বড় করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। নতুন করে দায়িত্ব বণ্টনের পাশাপাশি কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে উপদেষ্টাকেও রাখা হয়েছে। আবার কিছু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একাধিক মন্ত্রীর হাতে রয়েছে।
সরকারের পরিধি বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তে প্রশাসনিক কাজের গতি বাড়বে, নাকি দায়িত্ব ও কর্তৃত্বের বিভাজন থেকে সমন্বয়হীনতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে—এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
একই মন্ত্রণালয়ে একাধিক দায়িত্বশীল কেন?
একটি মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় সাধারণত মন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিমন্ত্রীও দায়িত্ব ভাগ করে নেন।
কিন্তু এর সঙ্গে যখন উপদেষ্টার মতো আরেকটি পদ যুক্ত হয়, তখন কে কোন বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন, কার পরামর্শ কতটা কার্যকর হবে এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা কার নির্দেশনা অনুসরণ করবেন—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে একই মন্ত্রণালয়ে একাধিক রাজনৈতিক দায়িত্বশীল থাকলে দায়িত্বের সীমা স্পষ্ট না হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সরকারের আকার বাড়ানোর পেছনে কী যুক্তি?
বড় সরকারের পক্ষে যুক্তি হতে পারে, দেশের বিভিন্ন খাত ও জটিল নীতিগত বিষয় সামলাতে অতিরিক্ত দায়িত্বশীল ব্যক্তির প্রয়োজন রয়েছে। এতে মন্ত্রণালয়ের কাজ ভাগ করে দেওয়া এবং নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিপরীত দিকও রয়েছে। বেশি মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তর বাড়তে পারে। একই বিষয়ে একাধিক ব্যক্তির মতামত এলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতেও সময় লাগতে পারে।
একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একজনের হাতে
সরকারের নতুন কাঠামোর আরেকটি আলোচিত দিক হলো—কিছু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একই ব্যক্তির হাতে রাখা হয়েছে।
এতে প্রশাসনিক ব্যয় ও মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখার সুবিধা থাকতে পারে। তবে একসঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে কোনো মন্ত্রীর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়।
উপদেষ্টা থাকলে কী বাড়ে, কী কমে?
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপদেষ্টারা বিশেষজ্ঞ মতামত ও নীতিগত পরামর্শ দিতে পারেন। বিশেষ করে অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, প্রযুক্তি বা কোনো নির্দিষ্ট খাতে অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে যুক্ত করা হলে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আসতে পারে।
কিন্তু উপদেষ্টার পরামর্শ এবং মন্ত্রীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বের মধ্যে সীমারেখা স্পষ্ট না হলে ক্ষমতার দ্বৈততা বা সিদ্ধান্তের জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সরকারের আকার বাড়লেই কি সমস্যা?
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় সাধারণত সরকারের সদস্যসংখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে দায়িত্বের স্পষ্ট বণ্টন ও জবাবদিহি।
একটি মন্ত্রণালয়ে কে নীতি নির্ধারণ করবেন, কে বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবেন এবং কোনো সিদ্ধান্তের জন্য শেষ পর্যন্ত কে দায়ী থাকবেন—এসব বিষয় পরিষ্কার থাকলে বড় মন্ত্রিসভাও কার্যকর হতে পারে।
অন্যদিকে দায়িত্বের সীমা অস্পষ্ট হলে ছোট সরকারেও সমন্বয়হীনতা তৈরি হতে পারে।
সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সমন্বয়
নতুন মন্ত্রিসভার সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে সরকারের বিভিন্ন অংশের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা।
মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং সচিবসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের দায়িত্ব যদি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকে, তাহলে বাড়তি জনবল সরকারের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। কিন্তু দায়িত্বের overlapping তৈরি হলে সেটিই উল্টো প্রশাসনিক জটিলতার কারণ হতে পারে।
তাই সরকারের আকার কত বড় হলো—তার চেয়ে বাড়তি দায়িত্বশীলদের মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।
এক নজরে
সরকার: তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার
পরিবর্তন: মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানো হয়েছে
আলোচিত বিষয়: মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীর পাশাপাশি উপদেষ্টা
আরেকটি বিষয়: কোনো কোনো মন্ত্রীর হাতে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব
মূল প্রশ্ন: বাড়তি দায়িত্বশীলদের কারণে সমন্বয় জটিল হবে কি না
চ্যালেঞ্জ: দায়িত্বের স্পষ্ট বণ্টন ও জবাবদিহি

0 Comments