Header Ads Widget

Responsive Advertisement

৩৫ টাকা কেজি দরে ৩ লাখ টন আমন ধান কিনবে সরকার


উপশিরোনাম: কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ৩ লাখ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্য; সিদ্ধ চাল ৪৯ ও আতপ চাল ৪৮ টাকা কেজি নির্ধারণ, ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে সংগ্রহ কার্যক্রম

নিজস্ব প্রতিবেদক | অর্থনীতি ও কৃষি ডেস্ক

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আমন মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে মোট ৮ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর মধ্যে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ৩ লাখ মেট্রিক টন ধান কেনা হবে প্রতি কেজি ৩৫ টাকা দরে। পাশাপাশি ৫ লাখ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল ৪৯ টাকা এবং ৫০ হাজার মেট্রিক টন আতপ চাল ৪৮ টাকা কেজি দরে সংগ্রহ করা হবে।

রোববার (৮ নভেম্বর) খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) সভা শেষে খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি সরকারের খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা, মূল্য নির্ধারণ এবং দেশের খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন।

সরকারের এ সিদ্ধান্তের অন্যতম উদ্দেশ্য কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত বজায় রাখা, খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি পরিচালনা এবং বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্যও এ সংগ্রহ কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ।

কোন খাদ্যশস্য কত দামে কিনবে সরকার?

সরকারের নির্ধারিত আমন সংগ্রহ কর্মসূচিতে তিন ধরনের খাদ্যশস্যের জন্য পৃথক মূল্য ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

খাদ্যশস্যসংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রাপ্রতি কেজির দাম
আমন ধান৩ লাখ মেট্রিক টন৩৫ টাকা
সিদ্ধ চাল৫ লাখ মেট্রিক টন৪৯ টাকা
আতপ চাল৫০ হাজার মেট্রিক টন৪৮ টাকা
মোট৮ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন—

এ কর্মসূচির আওতায় ধান সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হবে। অন্যদিকে সিদ্ধ ও আতপ চাল সংগ্রহের জন্য চালকল মালিক ও সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি সরকারি সংগ্রহব্যবস্থার নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হবে।

এখানে ধান ও চালের দামের পার্থক্য বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। ধান থেকে চাল উৎপাদনের সময় ধানের খোসা ও অন্যান্য অংশ বাদ যায়, ফলে এক কেজি ধান থেকে এক কেজি চাল পাওয়া যায় না। ধান শুকানো, ভাঙানো, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও সংরক্ষণের খরচও রয়েছে। তাই ধান ও চালের সরকারি সংগ্রহমূল্য এক নয়।

কবে শুরু হবে ধান ও চাল সংগ্রহ?

খাদ্যমন্ত্রীর ঘোষণার ভিত্তিতে আমন ধান সংগ্রহ শুরু হবে ১৪ নভেম্বর থেকে। অন্যদিকে চাল সংগ্রহ শুরু হবে ১ ডিসেম্বর থেকে। উভয় কার্যক্রম ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলার কথা জানানো হয়েছে।

অর্থাৎ ধান সংগ্রহের সময়সীমা তুলনামূলকভাবে আগে শুরু হবে। কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের পর তা সরকারি গুদামে সংরক্ষণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাত করার সুযোগ তৈরি হবে। চাল সংগ্রহের কার্যক্রম শুরু হবে ডিসেম্বর থেকে।

সংগ্রহের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে খাদ্য বিভাগের সংগ্রহকেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

৩৫ টাকা কেজি দরে ধান বিক্রি করলে কৃষক কত পাবেন?

সরকারের নির্ধারিত দরে ধান বিক্রি করলে কৃষকের সম্ভাব্য আয় কত হতে পারে, তা সহজ হিসাবেই বোঝা যায়।

উদাহরণ হিসেবে, একজন কৃষকের কাছে যদি ১ হাজার কেজি ধান থাকে এবং তিনি পুরো ধান সরকারকে প্রতি কেজি ৩৫ টাকা দরে বিক্রি করতে পারেন, তাহলে তাঁর মোট বিক্রয়মূল্য হবে ৩৫ হাজার টাকা।

একইভাবে—

  • ৫০০ কেজি ধান বিক্রি করলে পাওয়া যাবে ১৭ হাজার ৫০০ টাকা।

  • ১ হাজার কেজি ধান বিক্রি করলে পাওয়া যাবে ৩৫ হাজার টাকা।

  • ২ হাজার কেজি ধান বিক্রি করলে পাওয়া যাবে ৭০ হাজার টাকা।

  • ৫ হাজার কেজি ধান বিক্রি করলে পাওয়া যাবে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

তবে এগুলো কেবল নির্ধারিত দরে বিক্রির গাণিতিক হিসাব। কৃষকের প্রকৃত লাভ নির্ভর করবে জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিকের মজুরি, ফসল কাটা, শুকানো ও পরিবহনসহ মোট উৎপাদন খরচের ওপর।

আরেকটি বিষয় হলো, সরকার ৩ লাখ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ফলে প্রত্যেক কৃষক তাঁর সব ধান সরকারি ব্যবস্থায় বিক্রি করতে পারবেন—এমন নিশ্চয়তা শুধু এই ঘোষণার মাধ্যমে পাওয়া যায় না। সংগ্রহের নীতিমালা, কৃষকের নিবন্ধন, ধানের মান এবং বরাদ্দের নিয়মও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

গত বছরের তুলনায় ধান ও চালের দামে কী পরিবর্তন?

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত আমন মৌসুমে সরকার প্রতি কেজি ধান ৩৪ টাকা, সিদ্ধ চাল ৫০ টাকা এবং আতপ চাল ৪৯ টাকা দরে সংগ্রহ করেছিল। এবার ধানের সংগ্রহমূল্য এক টাকা বাড়িয়ে ৩৫ টাকা করা হয়েছে। তবে সিদ্ধ চালের দাম এক টাকা কমিয়ে ৪৯ টাকা এবং আতপ চালের দাম এক টাকা কমিয়ে ৪৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

গত মৌসুমে সরকার ১ লাখ ৫৩ হাজার মেট্রিক টন ধান এবং ৯ লাখ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ করেছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এবারের লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের বাস্তব সংগ্রহের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ গত বছর কতটা সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল এবং শেষ পর্যন্ত কতটা সংগ্রহ করা হয়েছিল—এ দুটি আলাদা হিসাব। তবে এবারের ঘোষণায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ টন হওয়ায় কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার ওপর তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেখা যাচ্ছে।

খাদ্য মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি

খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে ১৭ লাখ মেট্রিক টন চাল এবং ৩ লাখ মেট্রিক টন গম মজুত রয়েছে। খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় দেশের সার্বিক খাদ্য পরিস্থিতি, আমন সংগ্রহ, খাদ্যশস্যের মজুত, সরকারি বিতরণব্যবস্থা এবং খাদ্যশস্য আমদানির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত শুধু বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়; বরং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ওএমএস, ভিজিএফ, ভিজিডি এবং অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

উদাহরণ হিসেবে, কোনো এলাকায় বন্যা বা অন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে স্থানীয় খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হলে সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য থাকলে দ্রুত সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়। একইভাবে বাজারে চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে সরকারি বিতরণব্যবস্থার মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ থাকে।

তবে খাদ্য মজুতের পরিমাণের পাশাপাশি গুদামে খাদ্যের মান, সংরক্ষণকাল, পরিবহনব্যবস্থা এবং প্রকৃত বিতরণ কতটা হচ্ছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি সংগ্রহ কতটা কার্যকর?

ধানের মৌসুমে অনেক কৃষক ফসল কাটার পরপরই অর্থের প্রয়োজনে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন। এ সময় স্থানীয় বাজারে ক্রেতার চাহিদা, আড়তদার ও মিলমালিকদের ক্রয়ক্ষমতা এবং পরিবহন খরচের কারণে কৃষক সব সময় প্রত্যাশিত দাম পান না।

সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধান কিনলে কৃষকের জন্য একটি বিকল্প বিক্রয়ব্যবস্থা তৈরি হয়। বাজারদর কমে গেলে সরকারি সংগ্রহমূল্য কৃষকের দর-কষাকষির অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী করতে পারে।

তবে সরকারি সংগ্রহ কার্যকর হওয়ার জন্য কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি:

১. প্রকৃত কৃষকের কাছে সুবিধা পৌঁছানো: ধান কেনার তালিকায় প্রকৃত উৎপাদক কৃষকের নাম থাকা প্রয়োজন। মধ্যস্বত্বভোগী বা ব্যবসায়ীরা যেন কৃষকের নামে ধান সরবরাহ করে সুবিধা নিতে না পারেন, সে বিষয়ে নজরদারি দরকার।

২. সহজ নিবন্ধন ও বিক্রয়প্রক্রিয়া: কৃষকের নিবন্ধন, ধানের মান যাচাই, ওজন এবং মূল্য পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ হওয়া উচিত। জটিলতা থাকলে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকেরা সরকারি সংগ্রহব্যবস্থার বাইরে থেকে যেতে পারেন।

৩. সময়মতো অর্থ পরিশোধ: কৃষকেরা ফসল বিক্রির অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধ, পরবর্তী মৌসুমের বীজ-সার কেনা এবং পরিবারের প্রয়োজন মেটান। তাই ধান গ্রহণের পর দ্রুত অর্থ পরিশোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৪. পর্যাপ্ত সংগ্রহকেন্দ্র: প্রত্যন্ত এলাকার কৃষকদের দূরের খাদ্যগুদামে ধান নিয়ে যেতে হলে পরিবহন খরচ বাড়ে। স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত সংগ্রহকেন্দ্র থাকলে কৃষকের ব্যয় কমতে পারে।

৫. ধানের মান নির্ধারণে স্বচ্ছতা: আর্দ্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য মানদণ্ডের কারণে ধান গ্রহণে সমস্যা হতে পারে। এসব শর্ত আগেই কৃষকদের জানানো এবং মান যাচাইয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখা দরকার।

সামনে নজর থাকবে বাস্তব সংগ্রহ ও কৃষকের অংশগ্রহণে

সরকারের ঘোষিত ৮ লাখ ৫০ হাজার টন ধান-চাল সংগ্রহের কর্মসূচি খাদ্য মজুত ও কৃষকের ন্যায্যমূল্য—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবে কতটা পূরণ হয়, কতজন কৃষক সরাসরি ধান বিক্রির সুযোগ পান এবং নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ করা হয় কি না, তার ওপর কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে।

এ ছাড়া বাজারে ধান ও চালের চলমান দাম, উৎপাদন খরচ, সরকারি গুদামের ধারণক্ষমতা এবং খাদ্য বিতরণ কর্মসূচির চাহিদার সঙ্গে সংগ্রহ কার্যক্রমের সমন্বয়ও জরুরি।

আমন মৌসুমের এ সংগ্রহ কার্যক্রম তাই শুধু সরকারি খাদ্য কেনার উদ্যোগ নয়; কৃষকের আয়, খাদ্যনিরাপত্তা এবং দেশের চালের বাজার স্থিতিশীল রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পদক্ষেপ।

Post a Comment

0 Comments