Header Ads Widget

Responsive Advertisement

পাঞ্জাবের আশ্রমে দুই নারীকে আটকে ধর্ষণের অভিযোগ, প্রধান পুরোহিতসহ গ্রেপ্তার ২


ভারতের অমৃতসরের রামতীর্থ কমপ্লেক্সের গুরু জ্ঞান নাথ আশ্রমে ২০২০ সালের মে মাসে পুলিশের অভিযান; দুই নারীকে উদ্ধার, গ্রেপ্তার দুই অভিযুক্ত, পলাতক আরও দুজনের বিরুদ্ধে মামলা।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের অমৃতসরে একটি আশ্রমে দুই নারীকে আটকে রেখে বারবার ধর্ষণের অভিযোগে মন্দিরের প্রধান পুরোহিতসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। ২০২০ সালের ১৮ মে রামতীর্থ কমপ্লেক্সের গুরু জ্ঞান নাথ আশ্রম বাল্মীকি তীর্থে অভিযান চালিয়ে ওই দুই নারীকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আশ্রমের প্রধান মহন্ত গিরধারি নাথ ও তাঁর সহযোগী বারিন্দর নাথকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার অন্য দুই অভিযুক্ত নাছট্টর সিং ও সুরজ নাথ পালিয়ে যান।

বাংলা টিভির ১ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঘটনাটি নতুন করে তুলে ধরা হয়েছে। তবে একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের আর্কাইভে একই ঘটনা ২০২০ সালের ১৮–২০ মে প্রকাশিত হয়েছে। ফলে এটি ২০২৬ সালের নতুন কোনো পুলিশি অভিযান বা গ্রেপ্তারের ঘটনা—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

কীভাবে সামনে আসে অভিযোগ?

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তৎকালীন প্রতিবেদন অনুযায়ী, আশ্রমে আটকে রাখা এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ জানিয়ে দুই নারী পাঞ্জাব রাজ্যের তফশিলি জাতি কমিশনের সদস্য তারসেম সিং সায়ালকারের কাছে লিখিত আবেদন করেন।

অভিযোগে তাঁরা জানান, আশ্রমের কয়েকজন ব্যক্তি তাঁদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন এবং তাঁদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও যোগাযোগের সুযোগ সীমিত করে রাখা হয়েছে। বিষয়টি কমিশনের সদস্যের নজরে আসার পর তিনি পুলিশকে অবহিত করেন।

অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় অমৃতসর পুলিশের একটি দল অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। অভিযানে পুলিশ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কমিশনের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন বলে সে সময়ের সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

পুলিশের অভিযান ও দুই নারীকে উদ্ধার

২০২০ সালের ১৮ মে অমৃতসরের লোপোকে থানার আওতাধীন রামতীর্থ কমপ্লেক্সের গুরু জ্ঞান নাথ আশ্রম বাল্মীকি তীর্থে অভিযান চালায় পুলিশ।

অভিযানে আশ্রম থেকে দুই নারীকে উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে প্রধান পুরোহিত মহন্ত গিরধারি নাথ এবং তাঁর সহযোগী বারিন্দর নাথকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগে জড়িত আরও দুই ব্যক্তি নাছট্টর সিং ও সুরজ নাথ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।

তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তফশিলি জাতি কমিশনের সদস্য তারসেম সিং সায়ালকারের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি পলাতক অভিযুক্তদের খুঁজে বের করতে অভিযান চালানোর কথাও জানায় পুলিশ।

নির্যাতনের অভিযোগ ও ঘটনার পেছনের বিবরণ

তৎকালীন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোতে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের বরাতে বলা হয়, আশ্রমের দুই শিষ্য সুরজ নাথ ও নাছট্টর নাথের বিরুদ্ধে প্রথমে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে দুই নারী আশ্রমের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, আশ্রমের প্রধান পুরোহিত গিরধারি নাথ ও তাঁর সহযোগী বারিন্দর নাথও তাঁদের ওপর যৌন নির্যাতন চালান। দুই নারীকে আশ্রমে আটকে রাখা এবং তাঁদের যোগাযোগের সুযোগ সীমিত করার অভিযোগও উঠে আসে।

The Quint-এর ২০ মে ২০২০ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দুই নারীর একজন আশ্রমের ভেতর থেকে একটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। এরপর তাঁদের দুরবস্থার কথা পরিবারের সদস্যদের কাছে পৌঁছায় এবং বিষয়টি তফশিলি জাতি কমিশনের সদস্যের মাধ্যমে পুলিশের নজরে আসে।

তবে এসব বিবরণ ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ও সে সময়ের সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রকাশিত। অভিযোগের প্রতিটি বিষয় আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য এখানে পাওয়া যায়নি।

গ্রেপ্তার, পলাতক আসামি ও আইনি প্রক্রিয়া

পুলিশের অভিযানে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মামলার অন্য দুই অভিযুক্ত নাছট্টর সিং ও সুরজ নাথ পালিয়ে যান। তাঁদের গ্রেপ্তারে পুলিশ তল্লাশি চালাচ্ছিল বলে সে সময়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

The Tribune-এর ১৯ মে ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই নারীকে উদ্ধার করার পর তাঁদের অভিযোগের ভিত্তিতে চারজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও বেআইনি আটকে রাখার অভিযোগে মামলা করা হয়েছিল। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৬, ৩৭৯ ও ৫০৬ ধারার উল্লেখও সে সময়ের কয়েকটি প্রতিবেদনে পাওয়া যায়।

এখানে উল্লেখযোগ্য, গ্রেপ্তার হওয়া মানেই অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হওয়া নয়। অভিযোগের সত্যতা, প্রত্যেক অভিযুক্তের ভূমিকা এবং প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহির প্রশ্ন

ঘটনাটি শুধু একটি ফৌজদারি অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে আনে।

অনেক মানুষ ধর্মীয় আশ্রম বা উপাসনালয়ে যান আধ্যাত্মিক শান্তি, পরামর্শ, আশ্রয় কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান খুঁজতে। বিশেষ করে অসহায় বা সংকটে থাকা কেউ যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তির ওপর নির্ভর করেন, তখন সেই আস্থার অপব্যবহার হলে তাঁর ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

উদাহরণ হিসেবে, কোনো ব্যক্তি যদি আশ্রমে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হন এবং সেখানকার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছেই অভিযোগ জানাতে বাধ্য হন, তাহলে অভিযোগ গ্রহণের স্বাধীন ও নিরাপদ ব্যবস্থা না থাকলে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ কঠিন হয়ে যেতে পারে।

এ কারণে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, স্বাধীন তদন্তে সহযোগিতা, ভুক্তভোগীর পরিচয় ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে দ্রুত অভিযোগ পৌঁছানোর সুযোগ থাকা জরুরি।

তফশিলি সম্প্রদায়ের নারীদের নিরাপত্তা ও সামাজিক বাস্তবতা

ঘটনার অভিযোগকারীরা তফশিলি সম্প্রদায়ের নারী—এ তথ্যও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সামাজিক কাঠামোয় তফশিলি সম্প্রদায়ের মানুষ ঐতিহাসিকভাবে নানা ধরনের বৈষম্য ও বঞ্চনার মুখোমুখি হয়েছেন। নারী হওয়ার কারণে তাঁদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সামাজিক বাধার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের ঘটনায় অভিযোগকারী যেন সামাজিক পরিচয়, আর্থিক অবস্থা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির অবস্থানের কারণে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।

একই সঙ্গে কোনো অভিযোগের বিচার যেন পরিচয় বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে নয়, বরং নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং আইনের ভিত্তিতে হয়—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অমৃতসরের রামতীর্থ কমপ্লেক্সের আশ্রমে দুই নারীকে আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগে ২০২০ সালের মে মাসে পুলিশের অভিযানে দুই নারী উদ্ধার হন এবং দুই ব্যক্তি গ্রেপ্তার হন। আরও দুই অভিযুক্ত পালিয়ে যান বলে সে সময়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর প্রকাশিত বাংলা টিভির প্রতিবেদনটি একই পুরোনো ঘটনার বিবরণ পুনরায় তুলে ধরেছে; নতুন কোনো অভিযানের প্রমাণ এতে পাওয়া যায়নি।

Post a Comment

0 Comments