ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের বাগলকোট জেলায় একটি মন্দিরের মেলাকে কেন্দ্র করে জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ, মেলায় উচ্চবর্ণের মানুষদের যেখানে সাধারণ খাবার পরিবেশন করা হয়, সেখানে দলিত সম্প্রদায়ের মানুষদের আলাদাভাবে শুধু ‘গাঞ্জি’ দেওয়া হয়।
ঘটনাটি ঘটেছে বাগলকোট জেলার তেরাদাল তালুকের তামাদাদ্দি গ্রামে। সেখানে স্থানীয় লক্ষ্মী দেবী মন্দিরে ২ অক্টোবর মেলা অনুষ্ঠিত হয়। ঘটনাটি সামনে আসার পর তা নিয়ে এলাকায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ করেন দলিত সম্প্রদায়ের বাসিন্দা
ঘটনার বিষয়ে তেরাদাল থানায় অভিযোগ করেন গ্রামের দলিত সম্প্রদায়ের বাসিন্দা বাসাপ্পা ইয়ালাদাগাল। তার অভিযোগের ভিত্তিতে ৩ অক্টোবর পুলিশ মামলা নথিভুক্ত করে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, মেলায় খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রে সম্প্রদায়ভেদে আলাদা ব্যবস্থা করা হয়। উচ্চবর্ণের অংশগ্রহণকারীদের নিয়মিত খাবার দেওয়া হলেও দলিত সম্প্রদায়ের মানুষদের আলাদা করে শুধু ‘গাঞ্জি’ পরিবেশন করা হয়।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘গাঞ্জি’ বলতে সাধারণত ভাতভিত্তিক পাতলা বা গাঁজন করা খাবারকে বোঝানো হয়।
মামলায় প্রায় ২০ জনের নাম
পুলিশে করা অভিযোগে প্রায় ২০ জনের নাম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সুকুমার পাটিল, বাসবরাজ যাদওয়াদ, নন্দাপ্পা নন্দাপ্পানাভার, ভীমাপ্পা কোন্নুর ও সুরেশ আক্কিভাট্টির নাম রয়েছে।
তবে অভিযোগে নাম থাকা ব্যক্তিরা সবাই যে অপরাধে জড়িত—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। বিষয়টি পুলিশের তদন্ত ও পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
গান্ধী জয়ন্তীর দিনেই ঘটনার অভিযোগ
ঘটনাটির সময়কালও বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ২ অক্টোবর ভারতে মহাত্মা গান্ধীর জন্মবার্ষিকী, যা গান্ধী জয়ন্তী হিসেবে পালিত হয়।
গান্ধী জাতিভিত্তিক বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন অবস্থান নিয়েছিলেন। সেই দিনেই একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দলিতদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ ওঠায় ঘটনাটি নতুন করে সামাজিক সমতা ও জাতিভেদ প্রথা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ভারতের সংবিধানে অস্পৃশ্যতা নিষিদ্ধ
ভারতের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে ‘অস্পৃশ্যতা’ বিলোপ করা হয়েছে এবং এর যেকোনো ধরনের চর্চা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ধরনের বৈষম্য থেকে সৃষ্ট অধিকারহানি আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে।
এ ছাড়া Protection of Civil Rights Act, 1955-এ অস্পৃশ্যতার চর্চা, এর ভিত্তিতে সামাজিক অধিকার সীমিত করা এবং এ ধরনের বৈষম্যকে উৎসাহিত করার বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে।
একই গ্রামে আগেও অভিযোগ উঠেছিল
তামাদাদ্দি গ্রামে এর আগেও একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘পঞ্চকল্যাণোৎসব’ নামের ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগও স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছিল।
সাম্প্রতিক ঘটনার পর একই এলাকায় এ ধরনের অভিযোগ পুনরায় সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে আরও তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে।
তদন্তেই পরিষ্কার হবে প্রকৃত ঘটনা
বর্তমানে ঘটনাটি মূলত একটি অভিযোগ ও তার ভিত্তিতে দায়ের হওয়া মামলার পর্যায়ে রয়েছে। খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রে সত্যিই জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য করা হয়েছিল কি না, কারা এতে জড়িত ছিলেন এবং ঘটনার পেছনে কী পরিস্থিতি ছিল—এসব তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার কথা।
তবে অভিযোগটি ভারতের সংবিধান ও নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত আইনের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ধর্মীয় বা সামাজিক কোনো আয়োজনে মানুষের জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা আচরণ করা হয়ে থাকলে তা শুধু সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্ন নয়, আইনগতভাবেও গুরুতর বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
কর্ণাটকের বাগলকোটের এই ঘটনা তাই স্থানীয় একটি মন্দিরের মেলাকে ছাড়িয়ে ভারতে জাতিভিত্তিক বৈষম্য, সামাজিক সমতা ও নাগরিক অধিকারের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

0 Comments