জাতীয় ডেস্ক | রাষ্ট্র সংস্কার ও রাজনীতি
উপশিরোনাম: বিচার বিভাগ ও পুলিশ সংস্কার, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং সংসদের উচ্চকক্ষ নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য; বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি।
জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরের এক বছর পূর্ণ হলেও রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার, পুলিশকে জবাবদিহির আওতায় আনা, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো এখনো রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অধ্যাদেশের মাধ্যমে নেওয়া কিছু সংস্কার পরবর্তী সময়ে বাতিল হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, গণভোটে অনুমোদিত সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো কীভাবে এবং কোন আইনি প্রক্রিয়ায় কার্যকর করা হবে, তা নিয়েও ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী জোটের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মনে করছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্র সংস্কারের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, ক্ষমতার রাজনীতি এবং আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের কারণে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে আন্তরিকতার কথা বলা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য ও গণভোটের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সংস্কারের অঙ্গীকার বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে? আর রাষ্ট্র পরিচালনার প্রচলিত কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে হলে কোন কোন আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ প্রয়োজন?
কী ছিল জুলাই জাতীয় সনদের মূল লক্ষ্য?
জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও জবাবদিহি বাড়ানো। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রায় নয় মাস ধরে ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা করে।
২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সনদে স্বাক্ষর করে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ দল এতে সই করলেও কয়েকটি দল তখন স্বাক্ষর করেনি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তরুণদের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পরবর্তী সময়ে, ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সনদে স্বাক্ষর করে।
সনদে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ওপর কার্যকর সীমা আরোপ।
নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা।
বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ ও স্বাধীন ব্যবস্থা।
পুলিশ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
ভোটের অনুপাতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন।
নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারণ।
দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন।
এসব প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত শুধু ক্ষমতাসীন সরকারের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে না; বরং আইন, প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হবে।
ক্ষমতার ভারসাম্য বলতে কী বোঝায়?
ধরা যাক, কোনো রাজনৈতিক দল সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। সেই অবস্থায় সরকার আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব রাখতে পারে। কিন্তু সংসদের উচ্চকক্ষ, স্বাধীন বিচার বিভাগ, কার্যকর সংসদীয় কমিটি এবং স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া থাকলে এসব সিদ্ধান্তের ওপর বাড়তি নজরদারির সুযোগ তৈরি হয়।
জুলাই সনদের বিভিন্ন প্রস্তাবের পেছনে এমন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ধারণা কাজ করেছে। তবে সনদে স্বাক্ষর করলেই সব প্রস্তাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনে পরিণত হয় না। কোনো প্রস্তাব কার্যকর করতে সংবিধান সংশোধন, কোনোটি বাস্তবায়নে নতুন আইন, আবার কোনো ক্ষেত্রে বিধিমালা বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হতে পারে।
গণভোটে অনুমোদনের পরও কেন বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক?
২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত সংবিধান সংস্কার আদেশ জারি করে। এতে জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট আয়োজন এবং জনগণ আদেশ অনুমোদন করলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছিল।
সরবরাহ করা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাবের মধ্যে ৩৮টি বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতাসহ অনুমোদিত হয়। কিন্তু এসব প্রস্তাব কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে পরবর্তী সময়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
বিএনপির বক্তব্য অনুযায়ী, যেসব প্রস্তাবে দলটির নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত রয়েছে, সেগুলোসহ সংস্কার সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা হবে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং তাদের সঙ্গে থাকা বিরোধী পক্ষের দাবি, গণভোটে জনগণ যে কাঠামো অনুমোদন করেছে, সেই কাঠামো অনুযায়ী সংস্কার কার্যকর করতে হবে।
এখানে বিতর্কের দুটি আলাদা দিক রয়েছে।
প্রথমত, রাজনৈতিক অঙ্গীকার। সংলাপের সময় যেসব বিষয়ে দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছিল, ক্ষমতায় যাওয়ার পরও সেগুলো বাস্তবায়নে তারা কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে?
দ্বিতীয়ত, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। গণভোটের ফল কার্যকর করতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ, সংসদীয় সংশোধনী প্রক্রিয়া কিংবা অন্য কোনো আইনি পদ্ধতির মধ্যে কোনটি অনুসরণ করতে হবে?
এই দুই প্রশ্নের উত্তর এক নয়। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সংস্কারের আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়নপ্রক্রিয়াও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগের কয়েকটি কেন টিকল না?
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় এবং পুলিশ কমিশন-সংক্রান্ত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরবরাহ করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারক নিয়োগ কাউন্সিল-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় সেই কাঠামো বিলুপ্ত হয়েছে। পুলিশ কমিশনও গঠিত হয়নি।
সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের বক্তব্য অনুযায়ী, সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলো যেসব সংস্কারে একমত হয়েছিল, সেগুলোর কয়েকটি পরবর্তী সময়ে বাতিল হওয়া রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে যাওয়ার শামিল।
তাঁর বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে, জুলাই জাতীয় সনদকে স্বাক্ষরকারী দলগুলোর পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। গণভোটে জনগণের সম্মতি পাওয়ার পর সেটি বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তাও তিনি তুলে ধরেছেন।
তবে কোনো সংস্কার বাতিলের কারণ নির্ধারণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ, বাতিলের আইনি ভিত্তি এবং সরকারের ব্যাখ্যা আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক ঐকমত্য ছিল কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আইনগত প্রক্রিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিচার বিভাগ সংস্কার: স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রশ্ন
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রাষ্ট্র সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ, আদালত শুধু ব্যক্তিগত বিরোধ নিষ্পত্তি করে না; রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বৈধতা যাচাই, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিকার দেওয়ার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে।
জুলাই সনদে বিচারক নিয়োগের বিদ্যমান ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং নিয়োগ কাউন্সিলকে কমিশনে রূপান্তরের প্রস্তাব ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিচারক নিয়োগ কাউন্সিলের মাধ্যমে ২০২৫ সালে বিচারপতি নিয়োগও দেওয়া হয়েছিল বলে সরবরাহ করা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় সেই ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো, বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কীভাবে সীমিত করা হবে এবং যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা কীভাবে নিশ্চিত হবে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলায় বিচারকের সিদ্ধান্ত সরকারের পছন্দের সঙ্গে না মিললেও বিচারক যদি নিয়োগ, পদোন্নতি বা পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে নির্বাহী বিভাগের চাপমুক্ত থাকেন, তাহলে স্বাধীনভাবে বিচার করার প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ শক্তিশালী হয়।
তবে বিচারক নিয়োগ কমিশন গঠন করলেই বিচার বিভাগের সব সমস্যা দূর হবে না। কমিশনের সদস্য নির্বাচন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ম, নিয়োগের মানদণ্ড এবং জবাবদিহির ব্যবস্থাও কার্যকর হতে হবে।
পুলিশ কমিশন না হওয়া: জবাবদিহির সংস্কার কোথায়?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাগত স্বাধীনতা এবং জবাবদিহি নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদে পুলিশ কমিশন গঠনের বিষয়টিও ছিল। কিন্তু সরবরাহ করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিশনটি এখনো গঠিত হয়নি।
একটি কার্যকর পুলিশ কমিশনের দায়িত্ব আইন ও কাঠামোর ওপর নির্ভর করবে। তবে যথাযথ ক্ষমতা দেওয়া হলে এমন কমিশন নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পেশাগত মান এবং পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তির মতো বিষয়ে নজরদারি করতে পারে।
ধরা যাক, কোনো থানার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মামলা নেওয়া বা তদন্তে পক্ষপাতের অভিযোগ উঠল। স্বাধীন অভিযোগ-নিষ্পত্তি ব্যবস্থা থাকলে অভিযোগ যাচাই, তদন্তের মান পর্যালোচনা এবং দায় নির্ধারণের জন্য নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক পথ তৈরি হতে পারে।
অবশ্য শুধু কমিশন গঠন করলেই পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না। কমিশনের সদস্য বাছাই, তদন্তের ক্ষমতা, স্বাধীন বাজেট এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতাও গুরুত্বপূর্ণ।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার: নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধ
জুলাই জাতীয় সনদের অন্যতম আলোচিত প্রস্তাব হলো নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ রয়েছে। তাই এ ধরনের সরকার কীভাবে গঠিত হবে, প্রধান উপদেষ্টা কে নির্বাচন করবেন এবং কোনো রাজনৈতিক দল প্রক্রিয়াটিকে এককভাবে প্রভাবিত করতে পারবে কি না—এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদের মেয়াদপূর্তির ১৫ দিন আগে অথবা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সংসদ ভেঙে গেলে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হবে। এই সরকারের মেয়াদ হবে ৯০ দিন।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, বিরোধী দল থেকে মনোনীত ডেপুটি স্পিকার এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের প্রতিনিধিকে নিয়ে বাছাই কমিটি গঠনের কথা রয়েছে। কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন করবে।
তবে প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের একটি ধাপ নিয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট ছিল। দলটির বক্তব্য অনুযায়ী, পরবর্তী সংসদে সেই ধাপ নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। বিরোধী পক্ষের আশঙ্কা, সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ভবিষ্যতে এমন পরিবর্তন আনা হতে পারে, যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব বাড়ে।
এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যেও এ উদ্বেগ উঠে এসেছে। তাঁর মতে, গণভোটে অনুমোদিত কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত নয়।
এই বিরোধের সমাধানে প্রয়োজন প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের নিয়ম, ঐকমত্য না হলে বিকল্প পদ্ধতি, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং কোনো পক্ষের একক প্রভাব ঠেকানোর ব্যবস্থা স্পষ্ট করা। একই সঙ্গে নির্বাচন যেন অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
সংসদের উচ্চকক্ষ: ভোটের অনুপাত বনাম আসনের অনুপাত
জুলাই জাতীয় সনদে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এতে জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদনও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা।
অন্যদিকে, সরবরাহ করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি বিএনপির ৩১ দফার আলোকে সংসদে আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠনের কথা জানিয়েছে।
ভোটের অনুপাত এবং আসনের অনুপাত এক বিষয় নয়। কোনো দল জাতীয় নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ভোট পেলেও আসনসংখ্যার হিসাবে তুলনামূলক কম প্রতিনিধিত্ব পেতে পারে। ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠিত হলে সেই দল উচ্চকক্ষে তার ভোটের ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব পাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো দল জাতীয় নির্বাচনে ২০ শতাংশ ভোট পেলেও আসনসংখ্যায় তার প্রতিনিধিত্ব ১০ শতাংশ হতে পারে। ভোটের অনুপাত অনুসরণ করলে উচ্চকক্ষে দলটির প্রতিনিধিত্বের ভিত্তি হবে ২০ শতাংশ ভোট; আর আসনের অনুপাত অনুসরণ করলে ভিত্তি হবে সংসদে তার আসনের অংশ।
এই পার্থক্য উচ্চকক্ষের রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং সংবিধান সংশোধনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচন, ক্ষমতা, মেয়াদ এবং নিম্নকক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের পাশাপাশি কোন অনুপাত অনুসরণ করা হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা
জুলাই সনদে একজন ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী পদে সর্বোচ্চ ১০ বছর থাকার প্রস্তাব রয়েছে। তবে সংবিধানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত এ ধরনের সীমা কার্যকর করা সম্ভব হবে না। বিএনপিও এই সংস্কার বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সনদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নিয়োগের বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত।
এ ধরনের সংস্কারের উদ্দেশ্য হলো, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্বাচনে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নির্বাহী বিভাগের একক প্রভাব কমানো।
উদাহরণ হিসেবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও পেশাগত যোগ্যতাভিত্তিক হলে আর্থিক নীতি নির্ধারণে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা জোরদার হতে পারে। একইভাবে মানবাধিকার কমিশনের নেতৃত্ব নির্বাচনে নিরপেক্ষ বাছাইপ্রক্রিয়া থাকলে প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
তবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ালেই প্রতিষ্ঠানগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাধীন হয়ে যাবে না। নিয়োগের মানদণ্ড, প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই, বাছাই কমিটির ভূমিকা এবং সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
দুদক, পিএসসি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের প্রশ্ন
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি), মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং ন্যায়পালের মতো প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
জুলাই সনদে এসব প্রতিষ্ঠানে কমিটির মাধ্যমে নিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। কিন্তু সরবরাহ করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকার আগের মতোই নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে দুদক ও পিএসসিতে নিয়োগ দিয়েছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কতটা স্বচ্ছতা রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্ব পালনের সময় কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে।
কোনো দুর্নীতির অভিযোগে প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত চললে তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্বাচন ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্বাহী বিভাগের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া প্রত্যেক কর্মকর্তা পক্ষপাতদুষ্ট—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যথাযথ হবে না। বরং নিয়োগপ্রক্রিয়ার কাঠামো এমন হওয়া উচিত, যাতে যোগ্যতা ও সততার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগত স্বাধীনতাও নিশ্চিত হয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও আপিল বিভাগের বিচারপতির সংখ্যা
সনদে নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষের সদস্যদের গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সরবরাহ করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত না থাকলেও সেগুলো কার্যকর হয়নি।
এই উদাহরণগুলো দেখায়, রাষ্ট্র সংস্কারে বাধা সব সময় রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে সৃষ্টি হয় না। কখনো আইনগত প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকারের অভাবও অগ্রগতি থামিয়ে দিতে পারে।
গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তাবের লক্ষ্য হতে পারে সংসদ সদস্যদের ভোটদানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে মামলার চাপ, বিচারক নিয়োগের যোগ্যতা, অবকাঠামো এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দক্ষতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শুধু বিচারপতির সংখ্যা বাড়ালেই মামলাজট দূর হবে না; আদালতের অবকাঠামো, জনবল, মামলা ব্যবস্থাপনা ও শুনানির সময়সূচিও গুরুত্বপূর্ণ।
টিআইবির মূল্যায়ন: রাষ্ট্র সংস্কারের ভিত্তি কতটা শক্তিশালী?
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বলেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা ও রাষ্ট্র সংস্কারের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, ক্ষমতার রাজনীতি এবং আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের কারণে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
টিআইবির মূল্যায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনা ও সাহসী উদ্যোগের ঘাটতি এবং আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের সঙ্গে আপসের বিষয়ও উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য অনুযায়ী, সংস্কারের ভিত্তি শক্তিশালী না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই মূল্যায়ন থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে:
কোন সংস্কার আগে বাস্তবায়ন হবে এবং কোনটির জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন—এ বিষয়ে সময়সীমাবদ্ধ পরিকল্পনা কতটা স্পষ্ট ছিল?
দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনে প্রতিরোধ দেখা দিলে তা মোকাবিলার ব্যবস্থা কী ছিল?
সংলাপে অর্জিত রাজনৈতিক ঐকমত্য পরবর্তী সরকারে কীভাবে বজায় রাখা হবে?
গণভোটের পর নাগরিকদের কাছে সংস্কারের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি সরকারি গেজেট, সংসদের কার্যবিবরণী, সংশোধনী বিল, নিয়োগসংক্রান্ত নথি এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সামনে কী কী বিষয়ে নজর রাখা জরুরি?
জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন মূল্যায়নের জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
১. সংবিধান সংশোধনী বিল: গণভোটে অনুমোদিত প্রস্তাবগুলোর কতটি সংশোধনী বিলে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে এবং মূল সনদের সঙ্গে সেগুলোর সামঞ্জস্য কতটা থাকছে?
২. তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও উচ্চকক্ষ: সদস্য নির্বাচন, ক্ষমতা, মেয়াদ এবং প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের নিয়ম কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে?
৩. বিচার বিভাগ ও পুলিশ সংস্কার: বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় এবং পুলিশ কমিশন-সংক্রান্ত কাঠামো কীভাবে পুনর্গঠন করা হচ্ছে?
৪. সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা: দুদক, পিএসসি, মানবাধিকার কমিশন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে কি না?
৫. বাস্তবায়নের সময়সীমা: কোন সংস্কার কার্যকর হয়েছে, কোনটি প্রক্রিয়াধীন এবং কোনটি এখনো আলোচনায়—সরকার কি তার নিয়মিত ও যাচাইযোগ্য হিসাব প্রকাশ করছে?
জুলাই জাতীয় সনদ বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অধ্যায়। এর মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি আলোচনার কাঠামো তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু স্বাক্ষর ও গণভোটের পরও বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকায় সেই কাঠামোর কার্যকারিতা এখন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে। সরকার সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আর বিরোধী পক্ষ গণভোটে অনুমোদিত কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখার দাবি জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া, প্রস্তাবভিত্তিক বাস্তবায়ন পরিকল্পনা, কার্যকর সংসদীয় আলোচনা এবং অগ্রগতির নিয়মিত হিসাব প্রকাশ।
শেষ পর্যন্ত জুলাই জাতীয় সনদের মূল্য নির্ধারিত হবে শুধু স্বাক্ষরের ঐতিহাসিক মুহূর্ত দিয়ে নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীন হলো, নির্বাহী ক্ষমতার ওপর কতটা কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলো এবং নাগরিকেরা কতটা জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার সুফল পেলেন—তার ভিত্তিতে।

0 Comments