Header Ads Widget

Responsive Advertisement

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা: এমপি মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ, পরে জমা দিলেন পদত্যাগপত্র


মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় রাজনৈতিক চাপের মুখে সরে দাঁড়ালেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি

ঢাকা | ডেস্ক রিপোর্ট

রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পরে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন মিষ্টি।

এর আগে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আব্দুল্লাহ এম ছালেহ এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকেও তাঁকে সংসদ সদস্য পদ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়।

ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ও মামলা চলমান রয়েছে।

কী ঘটেছিল রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে?

গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে মিরপুর-১ নম্বর এলাকায় অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবেশ করে। সেখানে থাকা নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করার অভিযোগও রয়েছে। পরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের একটি টিনশেড ও তিনটি আধাপাকা ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

হামলার সময় চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকা, আসবাব ও অন্যান্য সামগ্রী লুটের অভিযোগ ওঠে। পরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জায়গায় ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙানো হয়।

১৯৭৪ সাল থেকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল কেন্দ্রটি

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি ১৯৭৪ সাল থেকে মিরপুর এলাকার নিম্নআয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল।

মা ও শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান, প্রজননস্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হতো সেখানে। স্থাপনাটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে জানা যায়।

ফলে ঘটনাটি শুধু একটি স্থাপনা ভাঙচুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগও সরাসরি যুক্ত।

মিষ্টির নাম কীভাবে আলোচনায় এলো?

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার পর স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য বিভিন্ন অনুসন্ধানে উঠে আসে। তাঁদের কয়েকজনকে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সঙ্গেও স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসে।

মিষ্টি ২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালে ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জায়গাটি সমিতির নামে বরাদ্দ চেয়ে করা পুরোনো একটি আবেদনে তাঁর স্বাক্ষর থাকার তথ্যও বিভিন্ন অনুসন্ধানে এসেছে।

তবে মিষ্টির বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে ওই সমিতির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর বা লুটপাটের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততাও নেই।

তদন্তে কী পাওয়া গেছে?

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় পুলিশের তদন্ত চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ৩০ সেপ্টেম্বর জানিয়েছিলেন, ঘটনায় কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

এর আগে পুলিশি তদন্ত নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মিষ্টির সম্ভাব্য অবস্থান নিয়েও আলোচনা হয়। তবে সিসিটিভি ফুটেজে তাঁকে ঘটনাস্থলে দেখা যায়নি বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং হামলায় তাঁর সরাসরি ভূমিকার প্রশ্নটি এখনো তদন্তের বিষয়।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে অভিযুক্ত বা তদন্তাধীন ব্যক্তিদের যোগাযোগ থাকা এবং সরাসরি অপরাধে তাঁর সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।

মামলা ও গ্রেপ্তার

হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় শাহ আলী থানায় মামলা হয়েছে। মামলায় স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।

২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে অন্তত ১০ জন গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়। তাঁদের কয়েকজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত সবাই আইনের আওতায় এসেছে কি না, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্পষ্ট নয়।

সাংগঠনিক পর্যায়েও ব্যবস্থা

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপির সাংগঠনিক পর্যায়েও একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বুধবার ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই সময়ে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল এবং ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করার খবর আসে। বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এর আগে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠায় শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়।

মিষ্টির রাজনৈতিক পরিচয়

ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য। এর আগে তিনি ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তাঁর প্রয়াত বড় ভাই নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সাবেক সংসদ সদস্য ও ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

চলতি বছরের ৩ মে মিষ্টি সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। সেটিই ছিল তাঁর প্রথম সংসদ সদস্যের মেয়াদ।

পদত্যাগের নির্দেশের পর কী হলো?

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় মিষ্টির নাম আলোচনায় আসার পর তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে চাপ বাড়তে থাকে। ১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন।

পরে ওই দিন দুপুরে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন বলে একাধিক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে।

ফলে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনা এখন একই সঙ্গে তিনটি পৃথক প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে—আইনগত তদন্ত, রাজনৈতিক-সাংগঠনিক ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম।

Post a Comment

0 Comments