আন্তর্জাতিক | ডেস্ক রিপোর্ট
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত ও কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে আবারও কঠোর সামরিক হুমকি দিয়েছেন। ৩০ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে যাওয়া হবে, নাকি দেশটির বিরুদ্ধে আরও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্যে ইরানকে ‘উড়িয়ে দেওয়ার’ সম্ভাবনার কথাও উঠে আসে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসান ও হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে ইরান জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে যুদ্ধ অবসানসংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক জবাব পেয়েছে। তবে ওই জবাবের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
‘চুক্তি অথবা সামরিক পদক্ষেপ’—ট্রাম্পের বার্তা
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরান সংকট দীর্ঘায়িত করার সুযোগ আর বেশি নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে খুব শিগগিরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তেহরানের সঙ্গে সমঝোতা করা হবে, নাকি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে ইরানকে ধ্বংস করার সম্ভাবনার কথাও উঠে আসে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁর বক্তব্যের এই অংশকে নতুন করে সামরিক হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছে।
তবে বক্তব্যটি একটি রাজনৈতিক ও সামরিক হুমকি, বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত সামরিক সিদ্ধান্তকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
ইরানের কাছ থেকে কী ধরনের প্রস্তাব এসেছে?
ইরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা, এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বন্দর অবরোধ শিথিল করা এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ উন্মুক্ত করার মতো শর্ত। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রস্তাবের কিছু মূল শর্ত গ্রহণ করেনি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় কূটনৈতিক যোগাযোগে যুক্ত ছিলেন। পরে ইরানের সরকার জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রস্তাবের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়া গেছে।
মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় কাতার ও পাকিস্তানও ভূমিকা রাখছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সমঝোতার ঘোষণা আসেনি।
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের বড় অংশ পরিবাহিত হয়।
তাই প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তেল পরিবহন, জাহাজ চলাচল, বীমা ব্যয়, জ্বালানি মূল্য এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন কিছুটা বাড়লেও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক পরিবহন কাঠামো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। বিকল্প পরিবহনপথ, জাহাজের ঘাটতি ও বাড়তি পরিবহন ব্যয় এখনো বাজারকে প্রভাবিত করছে।
যুদ্ধের পাশাপাশি চলছে কূটনৈতিক তৎপরতা
ইরান সংকটে একদিকে সামরিক চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের জবাব তারা পেয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে তেহরানে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোও সম্ভাব্য সমঝোতার পথ খুঁজছে।
এদিকে ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত খুব শিগগির শেষ হতে পারে। তবে তিনি কী ধরনের চুক্তি চান বা আলোচনায় কোন শর্তগুলো অপরিবর্তনীয়—তার পূর্ণাঙ্গ কাঠামো প্রকাশ্যে স্পষ্ট হয়নি।
ইরানের অবস্থান কী?
ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে আত্মসমর্পণ না করার বার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরান শক্তির কাছে নতি স্বীকার করবে না এবং অর্থবহ সংলাপের জন্য পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রয়োজন।
অর্থাৎ দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে প্রধান পার্থক্য এখনো রয়ে গেছে—যুক্তরাষ্ট্র চাপের মাধ্যমে সমঝোতার কাঠামো তৈরি করতে চাইছে, আর ইরান সামরিক চাপের মধ্যে নিজেদের শর্ত ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তের জায়গা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
সামনে কী হতে পারে?
ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্যে সামরিক চাপের ভাষা আরও স্পষ্ট হলেও এর পরিণতি নির্ভর করবে পরবর্তী কূটনৈতিক যোগাযোগ, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং দুই পক্ষের আলোচনার ওপর।
যদি সমঝোতা না হয়, তাহলে সামরিক উত্তেজনা আবার বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আর সংঘাত বাড়লে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, তেল পরিবহন এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা হলে যুদ্ধের বিস্তার ঠেকানোর পাশাপাশি জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

0 Comments