Header Ads Widget

Responsive Advertisement

কাগজে কৃষকের, দখলে রিমঝিম? রূপগঞ্জে শত শত বিঘা কৃষিজমি ভরাটের অভিযোগ


আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও পুরোনো পরিবেশগত আপত্তির মধ্যেও কৃষিজমি হারানোর অভিযোগ; প্রশ্নের মুখে ভূমি ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি

ডেস্ক রিপোর্ট

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একের পর এক কৃষিজমি, খাল-বিল ও জলাশয় হারিয়ে যাওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। এবার ‘রিমঝিম টাউন’ নামের একটি আবাসন প্রকল্পের বিরুদ্ধে শত শত বিঘা কৃষিজমি দখল ও বালু দিয়ে ভরাটের অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় জমির মালিক ও ভুক্তভোগীদের দাবি, বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন মৌজায় কৃষিজমি ভরাট করা হয়েছে এবং অনেক জমির মালিক নিজেদের জমিতে স্বাভাবিকভাবে যেতে পারছেন না।

সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, কুতুবপুর, মোচারতালুক, তারাইল, করাটিয়াসহ আশপাশের বিভিন্ন মৌজায় ভরাট ও দখলের পরিমাণ প্রায় ২৭ হাজার ৫০০ শতাংশ, যা প্রায় ৮৩২ বিঘার সমান। তবে এই পরিমাণটি স্থানীয় ভুক্তভোগীদের হিসাব—সরকারি চূড়ান্ত পরিমাপ হিসেবে এটিকে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।

একসময় ছিল ফসলের মাঠ, খাল ও জলাশয়

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রূপগঞ্জের এসব এলাকায় একসময় বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, নিচু জমি, খাল-বিল ও জলাশয় ছিল। বর্ষাকালে অনেক এলাকায় নৌযান চলাচল করত এবং জলাশয় ও কৃষিকাজকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছিল।

কিন্তু আবাসন প্রকল্পের সম্প্রসারণ, জমির মূল্য বৃদ্ধি এবং রাজধানীর কাছাকাছি এলাকায় নগরায়ণের চাপের সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপট পাল্টাতে থাকে।

সাম্প্রতিক সরেজমিন প্রতিবেদনে বিভিন্ন জায়গায় বালু ফেলে নিচু জমি উঁচু করার পাশাপাশি ‘রিমঝিম টাউন’ লেখা সাইনবোর্ড ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা থাকার কথা উঠে এসেছে।

জমি না কিনেই ভরাটের অভিযোগ

ভুক্তভোগীদের অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—কিছু জমি সরাসরি ক্রয় না করেও বালু ফেলে ভরাট ও দখলের চেষ্টা করা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পুরোনো তদন্তের তথ্যও এ অভিযোগকে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী, রিমঝিম টাউন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রায় ১২ হাজার ৯৬৯ শতাংশ কৃষিজমি ভরাটের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। একই তদন্তে করাটিয়া মৌজায় প্রায় ৪১টি পরিবারের প্রায় ৩ হাজার শতাংশ জমি দখল ও ভরাটের অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।

তবে বর্তমান সময়ে ভরাট হওয়া জমির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণে নতুন করে সরকারি জরিপ প্রয়োজন।

২০১৭ সালে আদালতের দ্বারস্থ জমির মালিকরা

রিমঝিম টাউনকে ঘিরে জমি ভরাটের অভিযোগ বহু বছরের পুরোনো। ২০১৭ সালে ৪৬ জন জমির মালিক কৃষিজমি রক্ষা ও ভরাট বন্ধের দাবিতে আদালতের আশ্রয় নেন বলে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

এরপর কৃষিজমি দখল ও ভরাট বন্ধ এবং জমির শ্রেণি পরিবর্তন না করার বিষয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞার কথাও নথিতে রয়েছে। ইতোমধ্যে ভরাট করা জমি পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগেও ২০২১ সালে দৈনিক ইত্তেফাক রূপগঞ্জের ভোলাবো ইউনিয়নের চারিতালুক এলাকায় হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে ফসলি জমি ও জলাশয় ভরাটের অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।

হাইকোর্টের রায়েও উঠে এসেছিল প্রকল্পটির নাম

২০১৮ সালে রিমঝিম পুলিশ টাউন ও ইটালিয়ান সিটি আবাসন প্রকল্পকে ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক সিদ্ধান্ত আসে।

প্রকাশিত আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, হাইকোর্ট রিমঝিম পুলিশ টাউন ও ইটালিয়ান সিটি প্রকল্পকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং প্রকল্পের জন্য ভূমির যে পরিবর্তন করা হয়েছে তা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

আদালতের নথি-ভিত্তিক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট জমিগুলোকে নাল ও কৃষিজমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই কৃষিজমি ভরাটের বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়েছিল।

এ কারণে বর্তমান অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু জমির মালিকানা নয়, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন, পরিবেশগত অনুমোদন এবং আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষকের জমি, কিন্তু কৃষকই কি হারাচ্ছেন?

রূপগঞ্জে কৃষিজমি কমে যাওয়ার বিষয়টি আরও বিস্তৃত একটি প্রবণতার অংশ। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে রূপগঞ্জে কৃষক পরিবারের সংখ্যা কমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছিল। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, একসময় যেখানে কৃষক পরিবারের সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৬৪২, পরে তা ২২ হাজার ১১৬-তে নেমে আসে। একই প্রতিবেদনে পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পসহ দ্রুত জমি বেচাকেনা এবং নগরায়ণের কারণে কৃষিজমি কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

অর্থাৎ, রিমঝিম টাউনকে ঘিরে অভিযোগটি শুধু একটি আবাসন প্রকল্পের সঙ্গে জমির বিরোধ হিসেবে দেখলে বিষয়টির বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বাদ পড়ে যায়। রূপগঞ্জে কৃষিজমির ওপর নগরায়ণ ও আবাসন সম্প্রসারণের চাপ একটি দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা।

স্থানীয়দের অভিযোগে প্রভাবশালীদের প্রসঙ্গ

সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে কয়েকজন ভুক্তভোগী স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতার অভিযোগ তুলেছেন। তারা অতীত ও বর্তমানের কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তির নামও উল্লেখ করেছেন।

তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেননি। রিমঝিম টাউনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওয়ালিউর রহমানের কাছ থেকেও অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সুতরাং অভিযোগগুলোকে বিচারিক বা সরকারি তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগ হিসেবেই দেখা উচিত।

কৃষিজমি ভরাট হলে শুধু জমির মালিকই ক্ষতিগ্রস্ত হন না

কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাটের প্রভাব জমির মালিকানার বিরোধের চেয়েও বড় হতে পারে।

নিচু জমি ও জলাশয় প্রাকৃতিকভাবে অতিরিক্ত পানি ধারণ করে। এগুলো ভরাট হলে বর্ষায় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন কমে গেলে স্থানীয় শ্রমবাজার ও কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর আয়ের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।

রূপগঞ্জের মতো দ্রুত নগরায়িত এলাকায় কৃষিজমি, জলাধার ও খালের পরিবর্তন তাই পরিবেশ, খাদ্য উৎপাদন এবং নগর পরিকল্পনা—তিনটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষণ: জমির কাগজ থাকলেই কি মালিকানা নিরাপদ?

এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—কাগজে জমির মালিকানা থাকা সত্ত্বেও একজন কৃষক যদি নিজের জমিতে যেতে না পারেন, তাহলে আইনি মালিকানা বাস্তবে কতটা কার্যকর?

আরেকটি প্রশ্ন হলো, কোনো জমি যদি আদালতের নিষেধাজ্ঞা বা পরিবেশগত বিধিনিষেধের আওতায় থাকে, তাহলে সেই জমিতে বালু ভরাট বা স্থাপনা নির্মাণ কীভাবে চলতে পারে?

তৃতীয় প্রশ্নটি প্রশাসনিক—কোন কর্তৃপক্ষ জমির শ্রেণি পরিবর্তন, বালু ভরাট এবং আবাসন প্রকল্পের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হলে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, প্রয়োজন সরকারি ভূমি রেকর্ড, মৌজা ম্যাপ, খতিয়ান, নামজারি, স্যাটেলাইট চিত্র, পরিবেশ অধিদপ্তরের নথি এবং আদালতের আদেশ মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত।

সামনে কী হওয়া উচিত?

রূপগঞ্জের কৃষিজমি নিয়ে চলমান অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—

  • অভিযোগ করা জমিগুলো নতুন করে সরকারি জরিপ ও সীমানা নির্ধারণ;

  • কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমোদন ও বৈধতা যাচাই;

  • আদালতের পূর্ববর্তী নির্দেশ বাস্তবায়নের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা;

  • পরিবেশগত ছাড়পত্র ও সংশ্লিষ্ট অনুমোদন পরীক্ষা;

  • জমির মালিকদের দলিল, খতিয়ান ও নামজারি যাচাই;

  • অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী দখল ও ভরাট বন্ধ করা;

  • একই সঙ্গে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও বৈধ মালিকানার দাবিও যথাযথভাবে যাচাই করা।

শেষ কথা

রূপগঞ্জের মাটি শুধু একটি জমির বাজার নয়; এই এলাকার কৃষিজমি, জলাশয় ও খাল স্থানীয় পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রার অংশ।

রিমঝিম টাউনকে ঘিরে ওঠা শত শত বিঘা কৃষিজমি দখল ও ভরাটের অভিযোগ সত্য কি না—তার চূড়ান্ত উত্তর দেবে সরকারি তদন্ত, নথিপত্র ও আদালত। তবে বহু বছর ধরে একই ধরনের অভিযোগ, পুরোনো পরিবেশগত তদন্ত এবং আদালতের নির্দেশের বিষয় সামনে আসায় ঘটনাটি নতুন করে গুরুত্ব পাওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

এখন সবচেয়ে জরুরি হলো—অভিযোগের রাজনৈতিক বা আবেগী ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে কার জমি, কার দখল, কোন অনুমোদনে ভরাট, আদালতের নির্দেশ কতটা বাস্তবায়িত এবং প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিয়েছে—এই পাঁচটি প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর বের করা।

কারণ কাগজে কৃষকের জমি যদি বাস্তবে কৃষকের কাছেই না থাকে, তাহলে সেটি শুধু একটি জমি বিরোধ নয়; এটি ভূমি অধিকার, পরিবেশ এবং আইনের শাসন—তিনটিরই পরীক্ষা।

Post a Comment

0 Comments