ডেস্ক রিপোর্ট
ভারতের নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম ও ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কমিশনের বিরোধ ক্রমেই প্রকাশ্য রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এবার দেশজুড়ে ধারাবাহিক আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিরোধীদের জোট ইন্ডিয়া (INDIA) ব্লক।
বুধবার নয়াদিল্লিতে জোটের বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধীসহ বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এক মঞ্চে মমতা-সোনিয়া
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগ ও আন্দোলনের বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে ছিলেন সোনিয়া গান্ধী। বৈঠক শেষে দুই নেতার পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ উপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্য তৈরি করেছে।
মমতা বলেন, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তারা আন্দোলন অব্যাহত রাখবেন। জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে আন্দোলন আরও জোরালো করার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
বিরোধী জোটের বৈঠকে শুধু কমিশনের নেতৃত্ব নয়, ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং ভোটারদের অধিকার নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
কী অভিযোগ বিরোধীদের?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচনী অনিয়ম এবং ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়টি তারা এর আগেও নির্বাচন কমিশনের কাছে তুলেছেন। মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে কারচুপির অভিযোগও তোলেন তিনি। একই সঙ্গে এসব বিষয়ে প্রতিকার পেতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার কথাও জানান।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এসব অভিযোগ বর্তমানে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি হিসেবে সামনে এসেছে। নির্বাচন কমিশন অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কমিশনের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন প্রসঙ্গে কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একটি প্রতিষ্ঠানে মতবিনিময় বা মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ম মেনেই নেওয়া হয়।
২ থেকে ৮ অক্টোবর দেশজুড়ে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ কর্মসূচি
বিরোধী জোটের বৈঠক থেকে ধারাবাহিক কর্মসূচির ঘোষণা এসেছে। ২ থেকে ৮ অক্টোবর বিভিন্ন এলাকায় ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ মিছিল এবং জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এই কর্মসূচির লক্ষ্য শুধু দিল্লিকেন্দ্রিক আন্দোলন না রেখে বিষয়টিকে রাজ্য ও জেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া। ফলে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপ আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে।
৬ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনমুখী মিছিল
ইন্ডিয়া জোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলোর একটি হবে ৬ অক্টোবর। ওই দিন বিরোধী দলের সাংসদরা দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের দপ্তর পর্যন্ত মিছিল করবেন।
জোটের পক্ষ থেকে সব বিরোধী সাংসদকে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিরোধী নেতারা ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আন্দোলনে তরুণদের যুক্ত করার পরিকল্পনা
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে জানিয়েছেন, আন্দোলনে তরুণদের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও ইন্ডিয়া জোটের শরিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের যুক্ত করা হবে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় সমাবেশ আয়োজনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আন্দোলনটি শুধু সংসদীয় বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচি হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে নেওয়ার চেষ্টা করছে জোটটি।
কেন বিষয়টি ভারতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতের নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। তাই কমিশনের নিরপেক্ষতা, ভোটার তালিকার যথার্থতা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু একটি নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—
প্রথমত, বিরোধী দলগুলো অভিযোগগুলো রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করার চেষ্টা করছে।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশন অভিযোগগুলো অস্বীকার করায় রাজনৈতিক বক্তব্য ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থানের মধ্যে সরাসরি বিরোধ তৈরি হয়েছে।
তৃতীয়ত, আন্দোলন যদি রাজ্য ও জেলা পর্যায়ে বিস্তৃত হয়, তাহলে এটি ভারতের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি মেরুকরণ তৈরি করতে পারে।

0 Comments