ঢাকা | ডেস্ক রিপোর্ট
রাজধানীর ইসিবি চত্বরের দক্ষিণ মানিকদীতে নিউগিনি প্রপার্টিজ আবাসন প্রকল্প ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা নিয়ে তদন্তে একাধিক দিক সামনে এসেছে। ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে সংঘটিত ওই ঘটনায় গুলিবর্ষণ, হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। মামলার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে; তাঁদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীও রয়েছেন।
ঘটনার পর প্রথমদিকে চাঁদাবাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হলেও পরে সালমান মুক্তাদির নিজেই জানান, তাঁর কাছে সরাসরি কেউ চাঁদা দাবি করেনি। একই সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হচ্ছে এবং নিউগিনি প্রপার্টিজ বা আশপাশের জমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট—যে পক্ষই জড়িত থাকুক, তদন্তের আওতায় আনা হবে।
কী ঘটেছিল নিউগিনি প্রপার্টিজে?
মামলার এজাহার ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে একদল ব্যক্তি নিউগিনি প্রপার্টিজ এলাকায় প্রবেশ করে হামলা চালায়। এ সময় গুলিবর্ষণ, মারধর, ভাঙচুর এবং মালামাল লুটের অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, হামলাকারীরা আগ্নেয়াস্ত্র ও বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এলাকায় প্রবেশ করে এবং প্রায় ৫০টি ফাঁকা গুলি ছোড়ে। হামলায় প্রকল্পের একজন সাইট ইঞ্জিনিয়ার ও নিরাপত্তাকর্মীসহ কয়েকজন আহত হন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিউগিনি প্রপার্টিজের পক্ষ থেকে করা মামলায় নগদ অর্থ, নির্মাণসামগ্রী, তার, রড, মোটরবাইকসহ বিভিন্ন মালামাল লুটের অভিযোগ করা হয়েছে। এজাহারে মোট ক্ষয়ক্ষতি ও লুট হওয়া মালামালের পৃথক অঙ্কও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ মামলার অভিযোগ, আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত তথ্য নয়।
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতেও হামলা
নিউগিনি প্রপার্টিজের ভেতরে প্রায় ৫ হাজার বর্গফুট জায়গায় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ছিল। হামলার সময় স্টুডিওটির টেলিভিশন, এসি, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় সালমান মুক্তাদিরও মামলা করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ একই সঙ্গে হামলার কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ঘটনার পেছনের বিরোধগুলো খতিয়ে দেখছে।
চাঁদাবাজির অভিযোগে কেন তৈরি হলো বিতর্ক?
হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে সালমান মুক্তাদির বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল—এমন অভিযোগ করেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
তবে পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানান, তাঁর কাছে সরাসরি কেউ চাঁদা দাবি করেননি। এই বক্তব্যের পরিবর্তনের পর হামলার প্রকৃত কারণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও জানিয়েছেন, তদন্তে এখন পর্যন্ত চাঁদাবাজির বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং সালমান মুক্তাদির নিজেও তাঁর কাছে চাঁদা চাওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে হামলার চূড়ান্ত কারণ নির্ধারণ করা হয়নি।
জমি ও মালিকানা বিরোধের বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে নিউগিনি প্রপার্টিজ এলাকার জমি ও যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে।
এক পক্ষের দাবি, প্রকল্পের ভেতরে থাকা জমি ও প্রবেশপথ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। অন্যদিকে নিউগিনি প্রপার্টিজের সংশ্লিষ্টরা জমির পরিমাণ ও মালিকানা নিয়ে ভিন্ন দাবি করেছেন। ফলে হামলার পেছনে কোনো সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ ভূমিকা রেখেছিল কি না, সেটিও তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে।
তবে জমি বিরোধই হামলার নিশ্চিত কারণ—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো তদন্ত-সমাপ্ত তথ্য এখনো প্রকাশ্যে নেই।
স্টুডিওর ভাড়া চুক্তি নিয়েও নতুন তথ্য
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও হিসেবে ব্যবহৃত প্রায় ৫ হাজার বর্গফুট জায়গার ভাড়া চুক্তিপত্রে তাঁর নিজের নাম নেই। ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর করা চুক্তিতে ইজারাগ্রহীতা হিসেবে এসএম রিফাত মেননের নাম থাকার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুক্তিতে জায়গাটি অফিস ও স্টুডিও ব্যবহারের জন্য নেওয়ার কথা থাকলেও তৃতীয় পক্ষকে সাব-লেট দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। এসব তথ্যের ভিত্তিতে স্টুডিও ব্যবহারের আইনি ও চুক্তিগত কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে এই চুক্তির বিষয়টি হামলার বৈধ কারণ বা কোনো ব্যক্তির অপরাধমূলক সম্পৃক্ততার প্রমাণ—এমন সিদ্ধান্ত এখনো দেওয়া হয়নি।
গ্রেপ্তার ও রিমান্ড
হামলার ঘটনায় পুলিশ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি আদালত মামলায় গ্রেপ্তার তিনজন—মামুন, আসলাম ও মুন্নাকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠান।
এর আগে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। মামলায় ১৩ জনের নাম উল্লেখ এবং আরও ১৫০ থেকে ২০০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে বলে আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
গ্রেপ্তার বা রিমান্ড অপরাধ প্রমাণের সমান নয়; তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।
সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাইল বিএফআইইউ
ঘটনাটিকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব ও লেনদেনের তথ্য চেয়েছে।
৩০ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পাঠানো বার্তায় তাঁর হিসাবের তথ্য, কেওয়াইসি নথি, হিসাব খোলার ফরম ও লেনদেনের বিবরণ চাওয়া হয়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে কেন এই তথ্য চাওয়া হয়েছে এবং এর সঙ্গে নিউগিনি প্রপার্টিজের হামলার সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, তা প্রকাশ্যে নিশ্চিত করা হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই না করা তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়া। একজন জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটরের বক্তব্য খুব অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারে। ফলে কোনো অভিযোগ পরে সংশোধন বা পরিবর্তন করা হলেও প্রাথমিক বক্তব্যের প্রভাব থেকে যেতে পারে।
এই ঘটনাও দেখিয়েছে, অভিযোগ, প্রত্যক্ষ তথ্য, তদন্তের ফলাফল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্য—এই চারটি বিষয়কে একই পর্যায়ে দেখা হলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

0 Comments