জাতীয় ডেস্ক
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ক্যাম্পাসে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা জারিকে কেন্দ্র করে প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তির প্রতিবাদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) বিক্ষোভ ও সমাবেশ করে। পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে ‘জবিয়ানদের গরুভোজ’ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে গরুর মাংস ও খিচুড়ির পাশাপাশি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের জন্য ছাগলের মাংসের ব্যবস্থাও রাখা হয় বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনাটি কেবল খাবারের আয়োজন কিংবা প্রশাসনিক নির্দেশনা নিয়ে বিরোধে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা, শিক্ষার্থীদের খাদ্যাভ্যাসের অধিকার, ক্যাম্পাসে সহাবস্থান এবং প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থী অনার্স শেষ করার আনন্দে ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চের কাছে গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেন। ওই স্থানের কাছাকাছি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দির অবস্থিত।
আয়োজনটি নিয়ে কয়েকজন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী আপত্তি জানান। তাঁদের অভিযোগ ছিল, মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্না করায় তাঁদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে। রান্নার চুলা তৈরিতে মন্দিরের ইট ব্যবহারের অভিযোগও ওঠে। এর প্রতিবাদে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন।
অন্যদিকে, আয়োজনকারী শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে ক্যাফেটেরিয়ায় রান্নার পরিকল্পনা থাকলেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় তাঁরা কাঠের চুলা ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। পরে ব্যবহৃত ইটগুলো মন্দিরের বলে জানতে পেরে সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয় এবং ক্যাফেটেরিয়া থেকে লোহার চুলা আনা হয়। তাঁরা অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন বলেও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রক্টরের হস্তক্ষেপে তাৎক্ষণিকভাবে সমস্যাটির সমাধান করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা হয়।
প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তি ঘিরে অসন্তোষ
১৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর ক্যাম্পাসে সব ধরনের পশু জবাই থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। নির্দেশনা অমান্য করলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও জানানো হয়।
তবে বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। তাঁদের প্রশ্ন ছিল, একটি নির্দিষ্ট স্থানে রান্না ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ঘিরে তৈরি হওয়া বিরোধের প্রতিক্রিয়ায় পুরো ক্যাম্পাসে পশু জবাই বন্ধ রাখার নির্দেশ কতটা যৌক্তিক।
শিক্ষার্থীদের একাংশের মতে, পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য নির্দিষ্ট স্থান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্যসম্মত রান্নার নিয়ম করা যেতে পারে। কিন্তু সব ধরনের পশু জবাই থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা শিক্ষার্থীদের খাদ্যাভ্যাস ও সাংস্কৃতিক চর্চার অধিকারে হস্তক্ষেপের আশঙ্কা তৈরি করে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—ক্যাম্পাসে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার নির্দেশকে সব ধরনের গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যথাযথ নয়। তবে নির্দেশনার পরিধি, প্রয়োজনীয়তা ও প্রয়োগ নিয়ে শিক্ষার্থীদের আপত্তি ছিল।
জকসুর বিক্ষোভ ও শিক্ষার্থীদের দাবি
১৪ অক্টোবর রাতে জকসুর উদ্যোগে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে ছিল বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার, প্রশাসনের প্রকাশ্য দুঃখপ্রকাশ, আগের নৈশভোজের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির অভিযোগ তদন্ত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় গরু ও খাসির মাংস অন্তর্ভুক্ত করা।
জকসুর নেতাদের বক্তব্য ছিল, প্রশাসনের সিদ্ধান্ত যেন কোনো শিক্ষার্থীর খাদ্যাভ্যাস বা ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অধিকারের ওপর অযৌক্তিক বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। তাঁদের দাবি, কোনো আয়োজন নিয়ে সমস্যা হলে তা নির্দিষ্ট ঘটনা, প্রমাণ এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নিয়মের ভিত্তিতে সমাধান করা উচিত।
প্রতিবাদের অংশ হিসেবে ‘জবিয়ানদের গরুভোজ’
প্রতিবাদের ধারাবাহিকতায় ১৬ অক্টোবর শিক্ষার্থীরা ‘জবিয়ানদের গরুভোজ’ কর্মসূচি পালন করেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আয়োজনের জন্য ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কেনা হয়। অংশগ্রহণে আগ্রহীদের জন্য জনপ্রতি ৭০ টাকা নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনগুলোতে আয়োজকদের বরাতে বলা হয়, কর্মসূচিতে অংশ নিতে প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী অনলাইনে নিবন্ধন করেছিলেন। বাড়তি প্রস্তুতি হিসেবে প্রায় ১ হাজার ৫০০ প্যাকেট খাবার প্রস্তুত রাখা হয় এবং খাবার বিতরণে ৫০ জনের বেশি স্বেচ্ছাসেবক কাজ করেন। ছয়টি বুথের মাধ্যমে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের টোকেন দেখিয়ে খাবার দেওয়া হয়।
১৬ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় গরুর মাংস ও খিচুড়ি বিতরণ করা হয়। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের জন্য গরুর মাংসের পরিবর্তে ছাগলের মাংসের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
আয়োজকদের কাছে কর্মসূচিটি ছিল প্রশাসনিক নির্দেশনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং ক্যাম্পাসে খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতার দাবি জানানোর প্রতীকী আয়োজন।
প্রশাসনের অবস্থান: জনস্বাস্থ্য, শৃঙ্খলা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি
বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক আজম খানের বক্তব্য অনুযায়ী, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পশু জবাইসংক্রান্ত গণবিজ্ঞপ্তির বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটিশ আকারে প্রকাশ করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে গরুভোজের আয়োজন করলে কর্তৃপক্ষের আপত্তি থাকবে না বলেও তিনি জানান। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর শিক্ষার্থীদের মৌখিক অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজ্ঞপ্তি নিয়ে সমালোচনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে জানায়, ক্যাম্পাসে পশু জবাইসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ রয়েছে; তবে কোনো আয়োজন যেন অন্যের অনুষ্ঠান বা কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির অবনতি এড়াতে প্রক্টরের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল এবং তা থেকে ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ায় প্রশাসন দুঃখ প্রকাশ করে।
এ থেকে বোঝা যায়, প্রশাসনের অবস্থানে জনস্বাস্থ্য, শৃঙ্খলা ও সম্ভাব্য উত্তেজনা এড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের আপত্তির মূল জায়গা ছিল নির্দেশনার পরিধি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং তা তাঁদের অধিকারের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ এবং পরবর্তী গরুভোজ কর্মসূচি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতা, জনস্বাস্থ্য ও ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রশ্নকে সামনে এনেছে। প্রশাসন জনস্বাস্থ্য ও শৃঙ্খলার কথা বলেছে; অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নির্দেশনাটিকে অযৌক্তিক ও অধিকারে হস্তক্ষেপমূলক বলে মনে করেছে।
এ ঘটনায় কোনো পক্ষকে আগেভাগে সাম্প্রদায়িক বা বিদ্বেষপ্রসূত হিসেবে চিহ্নিত না করে, অভিযোগ ও বক্তব্য যাচাই করে সমাধান খোঁজাই দায়িত্বশীল পথ। ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা যেমন জরুরি, তেমনি খাদ্যাভ্যাস ও সাংস্কৃতিক অধিকারের ক্ষেত্রেও সমান আচরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে প্রত্যাশা—ভবিষ্যতে এমন সিদ্ধান্ত যেন স্বচ্ছ, আনুপাতিক, যুক্তিনির্ভর এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়।

0 Comments