Header Ads Widget

Responsive Advertisement

১২ ডিসেম্বরের আগেই গঙ্গা চুক্তি: বাংলাদেশের সামনে পানি নিরাপত্তার বড় পরীক্ষা


নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের ৩০ বছরের পুরোনো চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আর বেশি সময় নেই। আগামী ১২ ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদ শেষ হচ্ছে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির। এর আগেই ভারতের সঙ্গে নতুন চুক্তি সম্পন্ন করতে চায় বাংলাদেশ। তবে এবার শুধু পুরোনো চুক্তি নবায়ন নয়—শুষ্ক মৌসুমে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে কার্যকর ‘গ্যারান্টি ক্লজ’সহ নতুন চুক্তি চায় ঢাকা।

বৃহস্পতিবার ঢাকায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) এক সেমিনার শেষে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি সাংবাদিকদের বলেন, ১২ ডিসেম্বরের আগেই নতুন গঙ্গা চুক্তি করার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে কাজ করছে। আলোচনায় বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো গ্যারান্টি ক্লজ ফিরিয়ে আনার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

শুধু নবায়ন নয়, নতুন চুক্তি চায় ঢাকা

১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ৩০ বছর মেয়াদি ওই চুক্তি অনুযায়ী প্রতিবছর মূলত জানুয়ারি থেকে মে—শুষ্ক মৌসুমে—ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার প্রবাহের ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে পানি ভাগ করা হয়।

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান হলো, বিদ্যমান চুক্তি কেবল মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়। পরিবর্তিত জলবায়ু, নদীর প্রবাহ, পানির ব্যবহার এবং বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি চুক্তি প্রয়োজন।

বিশেষ করে অস্বাভাবিকভাবে কম পানিপ্রবাহের সময় বাংলাদেশ যাতে একতরফাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য একটি কার্যকর নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি ব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে ঢাকা।

ফারাক্কায় কীভাবে পানি ভাগ হয়?

বর্তমান চুক্তির পরিশিষ্ট-১ অনুযায়ী ফারাক্কায় গঙ্গার প্রবাহের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে পানি ভাগের সূত্র নির্ধারিত রয়েছে।

  • প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশ সমানভাবে পানি পাবে।

  • প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে হলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫ হাজার কিউসেক, আর ভারত পাবে অবশিষ্ট পানি।

  • প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেক বা তার বেশি হলে ভারত পাবে ৪০ হাজার কিউসেক এবং অবশিষ্ট পানি যাবে বাংলাদেশে।

  • ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়পর্বে উভয় দেশ পালাক্রমে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

এই কাঠামোই গত তিন দশকে দুই দেশের পানি বণ্টনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

কেন ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

নতুন আলোচনায় গ্যারান্টি ক্লজকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দাবিতে পরিণত করার পেছনে মূল কারণ হলো শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিপ্রবাহের অনিশ্চয়তা।

১৯৭৭ সালের পানি বণ্টন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের জন্য একটি গ্যারান্টি ব্যবস্থা ছিল। পরবর্তী ব্যবস্থায় সেই ধরনের নিশ্চয়তা না থাকায় পানির প্রবাহ সংকটজনকভাবে কমে গেলে বাংলাদেশের ওপর ঝুঁকি বাড়ে—এমন মত পানি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে রয়েছে।

বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে তাই নতুন চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু ‘কত পানি পাওয়া যাবে’ নয়; বরং ‘কম পানি থাকলেও বাংলাদেশের ন্যূনতম প্রাপ্যতা কীভাবে আইনগতভাবে নিশ্চিত হবে’—এটাই বড় বিষয়।

ভারতের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ

ঢাকার সঙ্গে আলোচনা এগোলেও নয়াদিল্লির অবস্থান এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত নয়।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত ২৯ সেপ্টেম্বর জানান, গঙ্গাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যৌথ নদী কমিশনের কাঠামোর মাধ্যমে আলোচনা চলছে এবং গঙ্গা চুক্তি নিয়ে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক অব্যাহত রয়েছে।

এর আগে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংসদে জানিয়েছিল, ১৯৯৬ সালের চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৬-এ শেষ হবে এবং তখন পর্যন্ত চুক্তি নবায়ন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে বিষয়টি কারিগরি আলোচনার পর্যায়ে এগিয়েছে।

ভারতের অভ্যন্তরীণ চাপও বড় фактор

গঙ্গার পানি শুধু বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় ইস্যু নয়; ভারতের অভ্যন্তরেও এর সঙ্গে একাধিক রাজ্যের স্বার্থ জড়িত।

বিশেষ করে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের পানির চাহিদা নতুন চুক্তির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বিহারের উদ্বেগ ও স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। বিহারের পক্ষ থেকেও গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি রয়েছে।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের পানীয় জল, কৃষি, শিল্প এবং হুগলি নদীর নাব্যতা ও কলকাতা বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্বার্থও ফারাক্কা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত।

ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে নয়াদিল্লিকে একদিকে ঢাকার দাবি, অন্যদিকে নিজ দেশের রাজ্যগুলোর চাপ—দুই দিকই সামলাতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য শুধু পানি নয়, অর্থনীতির প্রশ্নও

গঙ্গার পানি বণ্টন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি নদী বা পরিবেশগত ইস্যু নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কৃষি, মৎস্য, নদী ও জীববৈচিত্র্য, নৌপথ, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতি।

শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ কমে গেলে নদীনির্ভর কৃষি ও মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে লবণাক্ততা বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে।

অন্যদিকে বর্ষায় অতিরিক্ত পানিপ্রবাহ ও আকস্মিক বন্যা বাংলাদেশের জন্য আলাদা ঝুঁকি তৈরি করে। ফলে বাংলাদেশের পানি কূটনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু শুষ্ক মৌসুমে পানি পাওয়া নয়; বরং পুরো অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা।

জলবায়ু পরিবর্তন বদলে দিচ্ছে পুরোনো হিসাব

১৯৯৬ সালের চুক্তির সময় যে জলপ্রবাহ, কৃষি চাহিদা ও পরিবেশগত বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল, তিন দশক পর পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, হিমবাহ ও উজানের জলপ্রবাহের পরিবর্তন এবং উভয় দেশের বাড়তে থাকা পানির চাহিদা ভবিষ্যতের পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলছে।

তাই নতুন চুক্তিতে শুধু ঐতিহাসিক প্রবাহের তথ্য নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ প্রভাব এবং অববাহিকাভিত্তিক পানির চাহিদা বিবেচনায় নেওয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সময়।

১২ ডিসেম্বরের মধ্যে একটি নতুন সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে কারিগরি আলোচনা থেকে দ্রুত রাজনৈতিক পর্যায়ের সিদ্ধান্তে যেতে হবে। কারণ পানির পরিমাণ, পরিমাপ পদ্ধতি, প্রবাহের পূর্বাভাস, গ্যারান্টি ক্লজ, কম প্রবাহের সময় ঝুঁকি ভাগাভাগি এবং বিরোধ নিষ্পত্তির মতো বিষয়গুলোতে ঐকমত্য তৈরি সহজ নয়।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নতুন চুক্তির জন্য নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার সর্বোত্তম সুরক্ষা নিশ্চিত করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বাংলাদেশের দরকষাকষিতে কী অগ্রাধিকার থাকা উচিত?

বাংলাদেশের স্বার্থে নতুন গঙ্গা চুক্তিতে কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে—

প্রথমত, ন্যূনতম পানিপ্রবাহের কার্যকর নিশ্চয়তা। শুধু ‘আলোচনা’ বা ‘সমন্বয়ের’ প্রতিশ্রুতি নয়, সংকটকালীন পানির নিশ্চয়তার জন্য স্পষ্ট ও প্রয়োগযোগ্য ব্যবস্থা থাকা দরকার।

দ্বিতীয়ত, যৌথ ও স্বচ্ছ পানি পরিমাপ ব্যবস্থা। ফারাক্কা থেকে বাংলাদেশের প্রবেশপথ পর্যন্ত প্রবাহের তথ্য উভয় দেশের জন্য নির্ভরযোগ্য ও নিয়মিতভাবে যাচাইযোগ্য হওয়া প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, জলবায়ু ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করা। ভবিষ্যতে গঙ্গার প্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে কীভাবে দুই দেশ ঝুঁকি ভাগ করবে, তা চুক্তিতে স্পষ্ট থাকা উচিত।

চতুর্থত, চুক্তির পর্যালোচনা ব্যবস্থা। দীর্ঘ মেয়াদের চুক্তি হলেও নির্দিষ্ট সময় পরপর বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে শর্ত পর্যালোচনার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

পঞ্চমত, অভিন্ন নদীগুলোকে একটি বৃহত্তর কাঠামোর আওতায় আনা। গঙ্গার পাশাপাশি তিস্তা ও অন্যান্য অভিন্ন নদী নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পানি কূটনীতির একটি সমন্বিত কৌশল বাংলাদেশের প্রয়োজন।

Post a Comment

0 Comments