ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় | ডেস্ক রিপোর্ট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) একটি আবাসিক হলের নাম পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের অবস্থানের মধ্যে নতুন করে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের নামে থাকা হলটির নাম পরিবর্তনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় সিনেট অধিবেশন থেকে ডাকসুর কয়েকজন প্রতিনিধি ওয়াকআউট করেছিলেন বলে জানিয়েছেন ডাকসু সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দেওয়া এক বক্তব্যে সাদিক কায়েম দাবি করেন, শেখ মুজিবুর রহমানের নামে থাকা হলের নাম পরিবর্তনের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার প্রতিবাদেই ডাকসু নেতারা সিনেট অধিবেশন থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। এ বিষয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিওও প্রকাশ করেছেন।
তবে বিষয়টি কেবল একটি নামফলক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষার্থীদের দাবি, ডাকসুর অবস্থান, সিন্ডিকেট ও সিনেটের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক নামকরণ কাঠামো।
নাম পরিবর্তনের দাবির সূত্রপাত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তনের দাবি নতুন নয়। ২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর রাতে হলের প্রধান ফটকের পুরোনো নামফলক সরিয়ে সেখানে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ লেখা হয়। পরে নাম পরিবর্তনের দাবিতে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ করার সুপারিশ করা হয়। একই সময়ে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের নাম পরিবর্তনেরও সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে এসব সুপারিশকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে কার্যকর করা হয়নি।
এর ফলে একদিকে হলের প্রবেশপথে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নাম ব্যবহার করা হলেও প্রশাসনিক ও নথিগত পর্যায়ে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি।
সিনেট অধিবেশনে কী ঘটেছিল?
এর আগে ২০২৬ সালের ২৯ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক সিনেট অধিবেশনে শেখ পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা পাঁচটি স্থাপনার নাম পরিবর্তনের বিষয় উত্থাপিত হয়। স্থাপনাগুলোর মধ্যে ছিল শেখ মুজিবুর রহমান হল, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল, রাসেল টাওয়ার, বঙ্গবন্ধু টাওয়ার ও সুলতানা কামাল হোস্টেল।
সিনেট অধিবেশনে নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বিষয়টি নিয়ম অনুযায়ী সিন্ডিকেটে পাঠানোর কথা জানান। এর পর ডাকসুর পাঁচ প্রতিনিধি অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যান।
ওয়াকআউট করা প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদ, এজিএস মুহাম্মদ মহিউদ্দিন, পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ এবং কার্যনির্বাহী সদস্য সাবিকুন্নাহার তামান্না।
শিক্ষার্থীদের হয়রানির দাবি
সাদিক কায়েমের বক্তব্য অনুযায়ী, হলের নামের কারণে শিক্ষার্থীদের পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পরিচয়কে কেন্দ্র করে তাদের ‘ভুক্তভোগী’ হতে হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি আরও দাবি করেন, শিক্ষার্থীদের মতামত নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও প্রস্তাব দেওয়ার পরও বিষয়টি এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
তবে এসব হয়রানি বা বৈষম্যের অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি। ফলে এগুলোকে ডাকসু নেতাদের বক্তব্য ও দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
কেন আবার পুরোনো নামফলক ফিরছে?
সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে, যখন হলের প্রধান ফটক থেকে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ লেখা সরিয়ে আবার ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ নাম ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
হলের একজন সিনিয়র প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই নামফলক পরিবর্তনের কাজ করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একদিকে শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিতে এক নাম রয়েছে, অন্যদিকে হলের ফটকে অন্য নাম থাকায় অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছিল।
অন্যদিকে হল সংসদের ভিপি মো. মুসলিমুর রহমান বলেছেন, হল সংসদকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হল সংসদ শেখ মুজিবুর রহমানের নাম পরিবর্তনের পক্ষে এবং বিষয়টির দ্রুত নিষ্পত্তি চায়।
মূল বিরোধ কোথায়?
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু মূলত তিনটি প্রশ্ন—
প্রথমত, হলটির আনুষ্ঠানিক নাম কী হবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের মতামতকে নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তৃতীয়ত, নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হিসেবে কার্যকর হবে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যাচ্ছে, সিন্ডিকেটের সুপারিশ, সিনেটের আলোচনা এবং হল প্রশাসনের বাস্তব পদক্ষেপ—এই তিন পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনিক প্রক্রিয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্থাপনার নাম পরিবর্তন শুধু নামফলক বদলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় না; এর সঙ্গে অফিসিয়াল নথি, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত জড়িত। ফলে কোনো নামফলক সাময়িকভাবে পরিবর্তিত হলেও সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত নাম হিসেবে গণ্য হবে কি না—তা নির্ভর করে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ওপর।
এই জায়গাতেই বর্তমান বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিকটি রয়েছে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নাম পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছে, ডাকসু সেটিকে প্রতিনিধিত্ব করছে; অন্যদিকে প্রশাসনিক পর্যায়ে বিষয়টি কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে কী হতে পারে?
হলের নাম নিয়ে চলমান বিরোধ নিষ্পত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট ও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের বক্তব্য, আগের সিন্ডিকেটের সুপারিশ এবং সিনেটের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করার বিষয়টি সামনে এসেছে।
নামফলক পরিবর্তনের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল নথি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতের বিভ্রান্তিও কমতে পারে।
.png)
0 Comments