ভোলায় গণসংবর্ধনায় দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ নিয়ে সরব স্পিকার; দুদকের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ, সরকারের জবাবদিহি ও মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েও বক্তব্য
জাতীয় ডেস্ক
আওয়ামী লীগকে ‘পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চোরের দল’ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ লুটপাটের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখেছিল এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে ভোলার লালমোহন উপজেলা পরিষদে আয়োজিত এক গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্পিকার। আন্তর্জাতিক সংসদীয় ইউনিয়নের (আইপিইউ) এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ায় উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে তাঁকে এ সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের শাসনামল, দুর্নীতির অভিযোগ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার, বর্তমান সরকারের জবাবদিহি এবং নিজ দলের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার, দুর্নীতির বিচার এবং জনপ্রতিনিধিদের দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
লুটপাট ও অর্থ পাচার নিয়ে স্পিকারের অভিযোগ
গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্পিকার বলেন, আওয়ামী লীগ মনে করেছিল, লুটপাটের মাধ্যমে ক্ষমতায় থেকে অনন্তকাল দেশ পরিচালনা করা সম্ভব হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দলটি বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
তবে অর্থ পাচার বা দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায় নির্ধারণে তদন্ত, আর্থিক নথিপত্র, প্রমাণ এবং আদালতের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বক্তব্যে উত্থাপিত অভিযোগ এবং আদালতে প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রসঙ্গে স্পিকারের বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো—রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ তদন্তের আওতায় আনা এবং আইন অনুযায়ী দায়ীদের জবাবদিহির মুখোমুখি করা।
হত্যা মামলার বিচার প্রসঙ্গে যা বললেন স্পিকার
বক্তব্যে স্পিকার দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সাজা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে মামলাভিত্তিক বিচারিক তথ্য, অভিযোগের প্রকৃতি, রায় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আইনি অবস্থান পৃথকভাবে যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো মামলায় সাজা হওয়ার তথ্য থাকলে সেটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রায় ও আদালতের নথি মিলিয়ে দেখা উচিত, যাতে অভিযোগ, দণ্ডাদেশ এবং আপিলসংক্রান্ত অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি না হয়।
বাক্স্বাধীনতা ও সরকারের সমালোচনা নিয়ে বক্তব্য
স্পিকার বলেন, বর্তমানে মানুষ সরকারের পাশাপাশি সরকারপ্রধানেরও সমালোচনা করতে পারছে। তাঁর বক্তব্যে বাক্স্বাধীনতা ও সরকারের জবাবদিহির বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের সমালোচনা করার অধিকার নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কার্যকর রাখতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা, আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের জবাবদিহি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু বক্তব্য নয়, বরং বাস্তবে সমালোচনার সুযোগ, অভিযোগ তদন্তের স্বচ্ছতা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমতা রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নারী সংসদ সদস্য ও ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ প্রসঙ্গ
নিজ দলের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদাহরণ তুলে ধরে স্পিকার জানান, একজন নারী সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে হাসপাতাল দখলের অভিযোগ ওঠার পর প্রধানমন্ত্রী তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন।
এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি। স্পিকারের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশের ওপর গুলিবর্ষণকারী মাদক ব্যবসায়ীদের দমনে ইশরাক হোসেন ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে অভিযানের সময় তাঁর হাতে অস্ত্র নেওয়াকে ঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করেন স্পিকার। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
এখানে হাসপাতাল দখলের অভিযোগ এবং অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে স্পিকারের বক্তব্যকে সংশ্লিষ্ট ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত বা বিচারিক সিদ্ধান্তের বিকল্প হিসেবে দেখা যায় না। অভিযোগের সত্যতা, ঘটনার পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন।
স্পিকার বলেন, নিজ দলের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আপসহীনতার পরিচয় দিয়েছেন।
গণসংবর্ধনায় উপস্থিত ছিলেন যারা
আন্তর্জাতিক সংসদীয় ইউনিয়নের (আইপিইউ) এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে এ গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনগুলো অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে লালমোহন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সিফাত বিন সাদেক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সত্যজিৎ কুমার ঘোষ, লালমোহন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম মজুমদার, উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাফর ইকবাল এবং সাধারণ সম্পাদক সফিকুল ইসলাম বাবুলসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
লালমোহনের গণসংবর্ধনায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের বক্তব্যে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ, বিচারিক পদক্ষেপ, সরকারের জবাবদিহি এবং নিজ দলের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করতে পারে। তবে এসব বক্তব্যের বাস্তব মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ, আইনের সমান প্রয়োগ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা। রাজনৈতিক অবস্থান যা-ই হোক, রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুরক্ষা ও জনস্বার্থে জবাবদিহি নিশ্চিত করা একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

0 Comments