Header Ads Widget

Responsive Advertisement

ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা, গ্রেপ্তার ১


জাতীয় ডেস্ক

ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় নির্মাণাধীন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনায় ব্যাপক ক্ষোভ ও নিন্দা দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ভাস্কর্যের মাথায় রশি দিয়ে জুতার মালা ঝোলানোর ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আব্দুর রহমান সম্রাট নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি ঘটনার পেছনে অন্য কেউ বা কোনো সংগঠিত চক্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হয়েছে।

ভাস্কর্যে জুতার মালা, ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভ

স্থানীয় সূত্র ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, মঙ্গলবার দুপুরে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকার ব্যস্ত সড়কদ্বীপে নির্মাণাধীন ভাস্কর্যের মাথায় জুতার মালা ঝুলতে দেখা যায়। ঘটনাটির ছবি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুক্তিযোদ্ধা, স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।

খবর পেয়ে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলে গিয়ে জুতার মালাটি সরিয়ে দেন। পরে প্রশাসন ও পুলিশ ঘটনাটি তদন্তে সক্রিয় হয়।

গ্রেপ্তার একজন, তদন্তে আরও কেউ আছে কি না

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ঝিনাইদহ পৌর এলাকার কাঞ্চননগর মহল্লার আব্দুর রহমান সম্রাটকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি কী উদ্দেশ্যে এমন কাজ করেছেন এবং এর পেছনে অন্য কারও প্ররোচনা ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ঝিনাইদহের পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পেছনে কোনো উসকানি বা সংগঠিত চক্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে। তাই একজন গ্রেপ্তার হলেও তদন্ত এখানেই শেষ হচ্ছে না।

জরুরি বৈঠক, গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি

ঘটনার পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জেলা প্রশাসন, পুলিশ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ এবং বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পরিবারের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দ্রুত প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

কেন ভাস্কর্যটি এখনো নির্মাণাধীন?

ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ভাস্কর্যটি এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। কয়েক মাস ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ ও স্থাপনাটি অরক্ষিত অবস্থায় থাকার বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনায় ছিল।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুলাইয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে নির্মাণাধীন হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যের কাজ আংশিক হওয়ার পর সড়ক নিরাপত্তার ঝুঁকির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় লোকজন ও বাস টার্মিনালের শ্রমিকরা দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে ভাস্কর্যের চারপাশের কিছু কংক্রিটের দেয়াল ভেঙে দেন।

এরপর ২২ জুলাই জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, মুক্তিযোদ্ধা, পরিবারের সদস্য ও বিভিন্ন অংশীজনকে নিয়ে সভা হয়। সেখানে উপযুক্ত স্থানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি পূর্ণাঙ্গ ও নান্দনিক ভাস্কর্য নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাস টার্মিনাল-সংলগ্ন চত্বরটির নাম ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর’ করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল।

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের একজন এবং ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খোর্দ্দ খালিশপুর গ্রামের সন্তান। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর সিলেটের ধলই সীমান্তে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহযোদ্ধাদের জীবন রক্ষার জন্য শত্রুর বাঙ্কার ধ্বংসের চেষ্টা করতে গিয়ে শহীদ হন। তাঁর অসামান্য বীরত্ব ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ প্রদান করা হয়।

শহীদ হওয়ার ৩৬ বছর পর ২০০৭ সালের ১১ ডিসেম্বর তাঁর দেহাবশেষ বাংলাদেশে এনে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পুনঃসমাহিত করা হয়।

শুধু অবমাননার তদন্ত নয়, স্মৃতির সুরক্ষাও জরুরি

ঘটনাটিকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলা সমস্যা হিসেবে দেখলে এর বড় প্রেক্ষাপটটি বাদ পড়ে যায়। একজন বীরশ্রেষ্ঠের স্মৃতিচিহ্ন নির্মাণাধীন অবস্থায় দীর্ঘদিন অরক্ষিত থাকলে সেটি স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন তৈরি করে।

প্রথমত, ঘটনার পূর্ণ তদন্ত প্রয়োজন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিই একমাত্র জড়িত কি না, নাকি আরও কেউ পরিকল্পনা বা প্ররোচনায় যুক্ত ছিল—তদন্তে তা স্পষ্ট হওয়া উচিত।

দ্বিতীয়ত, ভাস্কর্য নির্মাণ দ্রুত সম্পন্ন করা প্রয়োজন। জুলাইয়ের সভায় নতুন করে নান্দনিক ভাস্কর্য নির্মাণের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা যেন আর না হয়।

তৃতীয়ত, স্মৃতিচিহ্নের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্মারক, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে নির্মিত স্থাপনাগুলোতে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সিসিটিভি এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি থাকা প্রয়োজন।

চতুর্থত, স্মৃতির রাজনীতির বাইরে জাতীয় বীরদের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ নন; তাঁর আত্মত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অংশ। তাই তাঁর নামে নির্মিত স্থাপনার ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণেও দল-মতের ঊর্ধ্বে জাতীয় দায়িত্ববোধ থাকা প্রয়োজন।

Post a Comment

0 Comments