সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ‘হানিট্র্যাপ’-এর মাধ্যমে পাকিস্তানি এক গোয়েন্দা অপারেটিভের কাছে সংবেদনশীল সামুদ্রিক তথ্য পাঠানোর অভিযোগে ভারতের এক নৌসেনা সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৩১ বছর বয়সী ওই নাবিকের নাম প্রদীপ মুখার্জি। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স (সিআই) সেল তাকে গ্রেপ্তার করেছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটোরে ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণকেন্দ্র আইএনএস অগ্রণি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, এরপর ‘হানিট্র্যাপ’
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, কয়েক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রদীপ মুখার্জির সঙ্গে এক নারীর যোগাযোগ তৈরি হয়। ওই নারী নিজেকে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হিসেবে পরিচয় না দিয়ে ধীরে ধীরে তার সঙ্গে অনলাইন সম্পর্ক গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ।
পরবর্তী সময়ে ওই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ভারতীয় নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হয় বলে তদন্তকারীরা দাবি করছেন। এ ধরনের কৌশলকে গোয়েন্দা কার্যক্রমে সাধারণত ‘হানিট্র্যাপ’ বলা হয়—যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আবেগ বা বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়।
কী ধরনের তথ্য নেওয়ার অভিযোগ
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রদীপের কাছ থেকে কৌশলগত নৌসম্পদ, নৌবহরের চলাচল এবং বিশাখাপত্তনমের নৌঘাঁটির কার্যক্রমের কাঠামো-সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে।
বিশাখাপত্তনমে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নৌ কমান্ডের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি রয়েছে। ফলে ওই অঞ্চলের নৌসম্পদ ও কার্যক্রমসংক্রান্ত তথ্য নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে স্পর্শকাতর বলে বিবেচিত হতে পারে। তবে ঠিক কী কী তথ্য আদান-প্রদান হয়েছে এবং তার কতটা সত্যিই শ্রেণিবদ্ধ বা গোপনীয় ছিল, সে বিষয়ে তদন্ত এখনো চলমান।
কোয়েম্বাটোরের প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকেই গ্রেপ্তার
গ্রেপ্তারের সময় প্রদীপ মুখার্জি কোয়েম্বাটোরের আইএনএস অগ্রণিতে একটি ম্যানেজমেন্ট ডেভেলপমেন্ট কোর্সে অংশ নিচ্ছিলেন। তিনি সেখানে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে অবস্থান করছিলেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স সেল তার সন্দেহজনক ডিজিটাল কার্যক্রম শনাক্ত করার পর তদন্ত শুরু করে। পরে তাকে নজরদারিতে রাখা হয় এবং পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়ার পর প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
২০১৪ সালে নৌবাহিনীতে যোগ দেন প্রদীপ
প্রদীপ মুখার্জি পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা। তিনি ২০১৪ সালে ভারতীয় নৌবাহিনীতে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে ইস্টার্ন নেভাল কমান্ডের অধীনে বিশাখাপত্তনমে কর্মরত ছিলেন।
তদন্তকারীদের নজরে আসার আগে তিনি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছিলেন। সন্দেহজনক অনলাইন যোগাযোগ ও ডিজিটাল কার্যক্রমের সূত্র ধরেই তার বিরুদ্ধে তদন্ত এগোয় বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়।
তদন্তে নজরে আসে ডিজিটাল যোগাযোগ
কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স সেল সীমান্তপারের গুপ্তচরবৃত্তি ও সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট হুমকি নিয়ে কাজ করে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রদীপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু সন্দেহজনক ডিজিটাল কার্যক্রম নজরে আসার পর তার ওপর নজরদারি শুরু হয়।
তদন্তকারীরা এখন ওই অনলাইন যোগাযোগের পরিধি, তথ্য আদান-প্রদানের ধরন এবং এতে অন্য কেউ যুক্ত ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন। একই সঙ্গে কথিত পাকিস্তানি অপারেটিভের পরিচয় ও তার সঙ্গে যোগাযোগের প্রকৃত উদ্দেশ্যও তদন্তের অংশ বলে জানা গেছে।
আরও কেউ জড়িত কি না, খতিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা
এ ঘটনায় শুধু একজন নাবিকের ভূমিকা ছিল, নাকি এর সঙ্গে আরও ব্যক্তি বা কোনো সংগঠিত নেটওয়ার্ক যুক্ত—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তদন্তকারীরা প্রদীপের ডিজিটাল যোগাযোগ, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট এবং কথিত তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়গুলো পরীক্ষা করছেন। পাশাপাশি কথিতভাবে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত নারীর প্রকৃত পরিচয় ও ভূমিকা যাচাই করা হচ্ছে।
‘গুপ্তচর’ হিসেবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়
প্রদীপ মুখার্জিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে গোপন বা শ্রেণিবদ্ধ তথ্য পাকিস্তানি অপারেটিভকে দেওয়ার অভিযোগে। এখন পর্যন্ত এসব অভিযোগ আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
তাই তাকে সরাসরি ‘পাকিস্তানি গুপ্তচর’ হিসেবে চিহ্নিত না করে ‘গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার নৌসেনা সদস্য’ বলা সাংবাদিকতাগতভাবে অধিক নির্ভুল। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা নির্ধারিত হবে।
ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার মধ্যে ঘটনা
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি সামনে এসেছে। বিশেষ করে সামরিক ও নৌ-নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য ফাঁসের অভিযোগ দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের অভিযোগও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা সংস্থার উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। এই ঘটনাও সেই বৃহত্তর নিরাপত্তা ঝুঁকির আলোচনাকে সামনে এনেছে।
তবে প্রদীপ মুখার্জির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা এবং কথিত তথ্য ফাঁসের প্রকৃত মাত্রা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

0 Comments