ডেস্ক রিপোর্ট
ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারিভাবে টিকা আনার উদ্যোগ না থাকলে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে ডেঙ্গুর টিকা আমদানির সুযোগ করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, সরকার নিজে টিকা আনতে না পারলে অন্তত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমদানির সুযোগ দেওয়া উচিত। এতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আগ্রহী মানুষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর হাতিরঝিলের মধুবাগ মাঠে ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াত আয়োজিত ‘৪–১০ অক্টোবর দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা সপ্তাহ’ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান।
টিকা আমদানিতে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার আহ্বান
শফিকুর রহমানের বক্তব্যের মূল কেন্দ্র ছিল ডেঙ্গু প্রতিরোধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। তিনি বলেন, সরকারিভাবে টিকা আনার উদ্যোগ না থাকলে বেসরকারিভাবে টিকা আমদানির পথ খুলে দেওয়া উচিত।
তাঁর অভিযোগ, সরকার নিজে টিকা আনবে না এবং বেসরকারি বাজারও উন্মুক্ত করবে না—এমন পরিস্থিতি হলে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
তবে ডেঙ্গুর টিকা আমদানির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, কার্যকারিতা, অনুমোদন, বয়সভিত্তিক ব্যবহার ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দেশনা বিবেচনা করা জরুরি। ফলে বেসরকারি আমদানির সুযোগ তৈরি হলেও তা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও চিকিৎসাবিষয়ক মানদণ্ডের আওতায় হওয়া প্রয়োজন।
‘দ্রুত মশা নিধনের বাস্তব কর্মসূচি প্রয়োজন’
শুধু টিকা নয়, ডেঙ্গুর মূল বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন বিরোধীদলীয় নেতা।
তিনি বলেন, মশা নিধনের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে হবে এবং ডেঙ্গু আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেন তিনি।
অনুষ্ঠান থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় সংবলিত লিফলেট ও ব্লিচিং পাউডার বিতরণ করা হয়।
সরকারের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা
বক্তব্যে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার পাশাপাশি সামগ্রিক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও সমালোচনা করেন শফিকুর রহমান।
তিনি দাবি করেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ডেঙ্গু ও হামের মতো রোগে মানুষের মৃত্যু নিয়েও তিনি সরকারের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তাঁর বক্তব্য, অতীত সরকারের সময়ের পরিস্থিতিকে দায়ী না করে বর্তমান সরকার গত কয়েক মাসে কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সেটিরও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।
তবে এসব বক্তব্য বিরোধীদলীয় নেতার রাজনৈতিক সমালোচনা ও দাবি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে; সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার পাল্টা বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও অভিযোগ
ডেঙ্গু কর্মসূচির অনুষ্ঠানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন জামায়াত আমির।
তিনি রাজধানীতে দিনের বেলায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটছে বলে অভিযোগ করেন এবং রাজধানীর পরিস্থিতি দিয়ে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এ সময় তিনি বিমানবন্দরে প্রবাসীদের লাগেজ কাটা ও মূল্যবান জিনিসপত্র চুরির অভিযোগের প্রসঙ্গও তোলেন। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করায় বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনাও বক্তব্যে
রাজধানীর রাড্ডা এলাকার একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও সম্পদ লুটের অভিযোগের প্রসঙ্গও বক্তব্যে তুলে ধরেন শফিকুর রহমান।
তিনি অভিযোগ করেন, ওই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তাঁর বক্তব্যে এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনার দাবি উঠে আসে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বা তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফলকে প্রতিবেদনে পৃথকভাবে যাচাই করা হয়নি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে রাজনৈতিক সংগঠনের মাঠপর্যায়ের কর্মসূচি
ডেঙ্গু প্রতিরোধে ৪ থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত দেশব্যাপী জনসচেতনতা সপ্তাহ পালন করছে জামায়াত। এর অংশ হিসেবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতা কার্যক্রম এবং পরিচ্ছন্নতা ও মশা নিয়ন্ত্রণে জনগণকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের পক্ষ থেকে মশার প্রজননস্থল হিসেবে পরিচিত খাল, নর্দমা ও আশপাশের এলাকাগুলো পরিষ্কার করার উদ্যোগের কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়।
‘সরকারের কাজ জনগণকে নিরাপদ রাখা’
শফিকুর রহমান বলেন, সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করা। জনগণ যেন নিরাপদে ঘুমাতে পারে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পায়, সে জন্য সরকারকে সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তিনি সরকারের প্রতি দ্রুত মশা নিধন, সামাজিক সচেতনতা এবং ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও সরকারের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সমালোচনা করেন এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংগঠনের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় সামনে যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ
শফিকুর রহমানের বক্তব্যে রাজনৈতিক সমালোচনার পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি বাস্তব বিষয় সামনে এসেছে—মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা, জনসচেতনতা এবং সম্ভাব্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল পেতে শুধু একটি পদক্ষেপের ওপর নির্ভর না করে মশার উৎস ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং জনগণের সচেতনতা—এসবকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
টিকার প্রশ্নেও একইভাবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, অনুমোদন, নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য নীতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সার্বিক বিশ্লেষণ
শফিকুর রহমানের বক্তব্যে ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে নয়, বরং সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও জননিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত করে দেখা হয়েছে।
বেসরকারিভাবে ডেঙ্গুর টিকা আমদানির সুযোগ দেওয়ার দাবি রাজনৈতিকভাবে আলোচিত হলেও বাস্তব জনস্বাস্থ্য নীতিতে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে টিকার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, অনুমোদন, নিরাপত্তা এবং কোন জনগোষ্ঠীর জন্য এটি উপযোগী—এসব বিষয়ের ওপর।
অন্যদিকে মশা নিধন ও রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো ডেঙ্গু মোকাবিলার তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে থাকতে পারে।
সুতরাং ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি সরকারের বাস্তব কর্মসূচি, হাসপাতালের প্রস্তুতি, মশা নিয়ন্ত্রণের ফলাফল এবং রোগীর মৃত্যুহার—এসব সূচকের দিকে নজর রাখাই হবে পরিস্থিতি মূল্যায়নের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

0 Comments