Header Ads Widget

Responsive Advertisement

এনএসআইয়ের তিন কর্মকর্তার বিদেশে অবস্থান ঘিরে প্রশ্ন, তদন্তে একাধিক অভিযোগ


পলাতক হিসেবে চিহ্নিত তিন কর্মকর্তাকে ঘিরে নথি, দায়িত্বে অনুপস্থিতি ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ; গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন

ঢাকা | বিশেষ ডেস্ক

বাংলাদেশের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা—ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (এনএসআই)-এর তিন কর্মকর্তার বিদেশে অবস্থান ও কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার ঘটনা ঘিরে গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আমার দেশ দাবি করে, সংস্থাটির যুগ্ম পরিচালক বদরুল আহমেদ (বিদ্যুৎ), উপপরিচালক আমিনুল হক পলাশ এবং সহকারী পরিচালক তানভীর হোসেন খন্দকার বিদেশে চলে গেছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।

প্রতিবেদনটিতে আরও দাবি করা হয়, তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অনুপস্থিতি, শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নথি নিয়ে অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। এনএসআইয়ের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান থাকার কথা বলা হয়েছিল।

ঘটনাটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এনএসআইয়ের ১৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তদন্ত শুরু করে। ওই তালিকায় বদরুল আহমেদ ও আমিনুল হক পলাশের নামও ছিল। তবে দুদকের তদন্তে নাম থাকা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত এর মাধ্যমে বোঝায় না।

তিন কর্মকর্তাকে ঘিরে যে তথ্য সামনে এসেছে

আমার দেশ-এর প্রতিবেদনে তিন কর্মকর্তার পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে যে তথ্য দেওয়া হয়, তা সংক্ষেপে এমন—

বদরুল আহমেদ (বিদ্যুৎ) ছিলেন এনএসআইয়ের যুগ্ম পরিচালক। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি আগে দুবাইয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেটে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে দেশে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি দায়িত্বে যোগ দেননি এবং দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকার কারণে তাকে পলাতক হিসেবে চিহ্নিত করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

আমিনুল হক পলাশ ছিলেন এনএসআইয়ের উপপরিচালক এবং কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশনে কনস্যুলার অ্যাটাশে হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আমার দেশ দাবি করে, ২০২৪ সালের নভেম্বরে তিনি কলকাতা থেকে লন্ডনে চলে যান এবং দেশে ফিরে আসার নির্দেশের পরও ফেরেননি।

তানভীর হোসেন খন্দকার ছিলেন এনএসআইয়ের সহকারী পরিচালক। প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে চাকরিতে যোগদানের সময় শিক্ষাগত সনদ নিয়ে অনিয়ম এবং প্রশিক্ষণকালীন বিভিন্ন শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। তার অবস্থান সম্পর্কেও প্রতিবেদনে নিশ্চিত তথ্যের পরিবর্তে তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য তুলে ধরা হয়।

বিদেশে যাওয়া নাকি দায়িত্ব থেকে বিচ্যুতি—মূল প্রশ্ন কোথায়?

ঘটনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কোনো সরকারি কর্মকর্তা বিদেশে অবস্থান করলেই তাকে আইনগত অর্থে ‘পলাতক’ বলা যায় না। এখানে মূল বিষয় হচ্ছে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েছিলেন কি না, দায়িত্বে ফেরার নির্দেশ পেয়েছিলেন কি না এবং সেই নির্দেশ পালন করেছেন কি না।

আমার দেশ-এর প্রতিবেদনে এনএসআই সূত্রের বরাতে বলা হয়, বদরুল আহমেদ ও আমিনুল হক পলাশকে দেশে ফিরে দায়িত্ব গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তারা নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ না দেওয়ায় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ফাইল পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

অর্থাৎ, ঘটনাটির প্রশাসনিক দিকটি শুধু বিদেশে অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সরকারি দায়িত্ব, অনুমোদিত ছুটি, প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ এবং চাকরির শৃঙ্খলাবিধির সঙ্গে বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত।

আমিনুল হক পলাশকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ

তিন কর্মকর্তার মধ্যে আমিনুল হক পলাশকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এসেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো নিয়ে।

আমার দেশ-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, তৎকালীন এনএসআই মহাপরিচালক টিএম জোবায়েরের অধীনে পলাশকে ড. ইউনূস ও তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলাসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনে মামলার প্রস্তুতি, অভিযোগকারী ও সাক্ষী নির্বাচন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের মতো বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়।

তবে এসব দাবির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এগুলো মূলত সংবাদ প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল। কোনো আদালতের রায় বা প্রকাশ্য সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে এই পুরো বর্ণনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন তথ্য ওই প্রতিবেদনে দেখানো হয়নি।

‘র’-এর সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ

প্রতিবেদনটিতে বদরুল আহমেদ ও আমিনুল হক পলাশের বিরুদ্ধে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর হয়ে কাজ করার অভিযোগও আনা হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচারের আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।

এ ধরনের অভিযোগ জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুতর। কিন্তু গোয়েন্দা তৎপরতা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য সাধারণত প্রকাশ্য নথিতে সহজে যাচাই করা যায় না। ফলে অভিযোগ, গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান এবং আদালতে প্রমাণিত তথ্য—এই তিনটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।

প্রতিবেদনে এনএসআই সূত্রের বক্তব্য হিসেবে তদন্ত চলার কথা বলা হয়েছিল; সুতরাং অভিযোগগুলোকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই।

তানভীরের শিক্ষাগত সনদ নিয়ে অভিযোগ

তানভীর হোসেন খন্দকারের বিরুদ্ধে প্রতিবেদনে আরও নির্দিষ্ট ধরনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, এনএসআইয়ে যোগদানের পর তার প্রশিক্ষণকালীন সময়ে একাধিক শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ওঠে এবং পরবর্তী সময়ে পুলিশি যাচাইয়ে তার মাস্টার্সের সনদ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশিক্ষণের পরীক্ষায় তার ফলাফলও সন্তোষজনক ছিল না এবং বিষয়টি তদন্তের জন্য বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। পরে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের কথা বলা হয়।

তবে জাল সনদ ব্যবহারের অভিযোগের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বিচারিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ড. ইউনূসের মামলা প্রসঙ্গ কেন সামনে এসেছে?

তিন কর্মকর্তার ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদনের বড় অংশ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী সময়ে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত।

আমার দেশ দাবি করেছে, ড. ইউনূস ও তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট ১৬৮টি মামলা হয়েছিল। প্রতিবেদনে এসব মামলার বড় অংশ শ্রম আদালতসংক্রান্ত এবং কিছু মামলা ফৌজদারি আদালত ও দুর্নীতি দমন কমিশনসংক্রান্ত বলে উল্লেখ করা হয়।

ড. ইউনূসের আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির তৎকালীন সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রতিবেদনে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও হয়রানির অভিযোগ তোলেন। এগুলো সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।

এনএসআইয়ের অভ্যন্তরীণ তদন্ত

তিন কর্মকর্তাকে নিয়ে প্রতিবেদনে এনএসআইয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্যও দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বেআইনি, রাজনৈতিক ও শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নথি পাঠানো হয়েছে।

এনএসআইয়ের পক্ষ থেকে সংস্থাটির অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়।

পরবর্তী সময়ে দুদকের তদন্তে নতুন মাত্রা

ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরবর্তী বিকাশ হলো, ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর দুদক এনএসআইয়ের ১৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্ত শুরু করে। দুদকের তদন্তে ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থপাচার এবং জ্ঞাত আয়ের বাইরে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়। ওই তালিকায় আমিনুল হক পলাশ ও বদরুল আহমেদের নাম ছিল।

এটি আলাদা একটি দুর্নীতি তদন্ত; ফলে এটিকে বিদেশে অবস্থান বা গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। বরং এটি দেখায় যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ পৃথক প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়ায় যাচাই করা হচ্ছিল।

Post a Comment

0 Comments