গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার খাগড়াবাড়িয়া গ্রামে গড়ে উঠছে এমএস মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। পুরোনো ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে কাঁচামাল উৎপাদনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের ব্যাটারি উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ধাপে ধাপে প্রায় ৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
তবে ব্যাটারি রিসাইক্লিং শিল্পের সঙ্গে পরিবেশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদ উৎপাদন প্রক্রিয়া সরাসরি জড়িত হওয়ায় এসব বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার প্রত্যাশা
এমএস মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও গ্রীন ডাইনেস্টি লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মনিরা খাতুন বলেন, স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা ছাড়া কারখানাটি গড়ে তোলা সম্ভব হতো না।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে একদিন এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কারখানাকে ঘিরে খাগড়াবাড়িয়া ও আশপাশের এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়তে পারে। ভবিষ্যতে এলাকাটি একটি শিল্পকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেতে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পুরোনো ব্যাটারি থেকে কাঁচামাল উৎপাদন
এমএস মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও গ্রীন ডাইনেস্টি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অ্যাডভোকেট সরিফুল ইসলাম দুর্জয় বলেন, কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, “দক্ষ কর্মী কখনো বেকার থাকে না।” দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে স্থানীয় তরুণদের শিল্পখাতে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন) শেখ নাজমুল হক সৈকত জানান, বর্তমানে পুরোনো ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে নতুন ব্যাটারি তৈরির কাঁচামাল উৎপাদন করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের ব্যাটারি উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তার দাবি, প্রতিষ্ঠানটিতে চীনা বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করেছেন এবং চীনের প্রকৌশলীরা কারখানায় কাজ করছেন। পাশাপাশি ভারত ও নেপালের ব্যবসায়ীরাও যৌথ বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জানান তিনি।
পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় কী ব্যবস্থা রয়েছে?
ব্যাটারি রিসাইক্লিং শিল্পে পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষের দাবি, কারখানা স্থাপনের সময় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, পুরোনো ব্যাটারির অংশ গলানোর প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় সম্পন্ন করা হয়। গলিত বর্জ্য যাতে কারখানার বাইরে ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, কারখানায় এয়ার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এটিপি) এবং এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) স্থাপন করা হয়েছে। তাদের দাবি, ব্যবহৃত পানি পরিশোধনের পর পুনরায় ব্যবহার করা হয় এবং ‘জিরো ডিসচার্জ’ ব্যবস্থা অনুসরণ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে স্ক্রাবার ও ফিউম এক্সট্রাকশন ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পরিশোধন প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত ডাস্ট নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয় বলেও তাদের দাবি।
কারখানায় স্ক্র্যাপ প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সেফটি ট্যাংক ও সোকওয়েল এবং শ্রমিকদের জন্য পৃথক টয়লেট ও বাথরুমের ব্যবস্থা রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
৫ হাজার কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়ন হবে?
প্রতিষ্ঠানটির ৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কাশিয়ানীর স্থানীয় শ্রমবাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে। সরাসরি কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরিবহন, খাবার, আবাসন, সরবরাহ ও অন্যান্য সেবা খাতেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে কত সময়ের মধ্যে এই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং পরিকল্পনাটি কোন ধাপে বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা, বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ কার্যক্রমের ওপর।
কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরিবেশগত নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ
এমএস মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে খাগড়াবাড়িয়ায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের মতো শিল্পের সম্প্রসারণের সঙ্গে পরিবেশগত নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন শিল্পের সম্ভাবনার পাশাপাশি নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের শিল্প উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখতে পারে।

0 Comments