Header Ads Widget

Responsive Advertisement

শিশুদের মধ্যে হামের ঝুঁকি: দেশজুড়ে সংক্রমণের পর টিকাদানে জোর, সর্বশেষ পরিস্থিতি


ডেস্ক রিপোর্ট

শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ নিয়ে ২০২৬ সালে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ তৈরি হয় বাংলাদেশে। সংক্রমণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার পর স্বাস্থ্য বিভাগ টিকাদান, রোগ শনাক্তকরণ, নজরদারি ও চিকিৎসাসেবা জোরদার করে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি হওয়ায় টিকাদান কর্মসূচিকে দেওয়া হয় বিশেষ গুরুত্ব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় হামের সংক্রমণ রিপোর্ট হয়েছিল। ওই সময় ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১৮ হাজারের বেশি সন্দেহজনক রোগী এবং প্রায় ২ হাজার ৯০০ ল্যাবরেটরি-নিশ্চিত রোগীর তথ্য পাওয়া যায়। আক্রান্তদের বড় অংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়। জুনের শেষ নাগাদ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সব ৬৪ জেলাতেই সন্দেহজনক হামের ঘটনা রিপোর্ট হয়েছিল এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই আক্রান্তদের বড় অংশ ছিল।

সর্বশেষ পরিস্থিতি কী বলছে?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর হালনাগাদ বুলেটিনে ২৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে নতুন সন্দেহজনক হাম রোগী, নিশ্চিত রোগী, হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর সংখ্যা—সব ক্ষেত্রেই শূন্য দেখানো হয়েছে। বিভাগভিত্তিক তালিকাতেও ওই সময়ের জন্য নতুন রোগী বা মৃত্যুর সংখ্যা শূন্য দেখানো হয়েছে।

এটি সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির উন্নতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হলেও হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে টিকাদান ও নজরদারি অব্যাহত রাখা জরুরি।

কোন এলাকায় সংক্রমণের চাপ বেশি ছিল?

প্রাদুর্ভাবের বিভিন্ন পর্যায়ে দেশের একাধিক বিভাগে হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা বিভাগে মোট সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল। একই সময়ে বরিশাল বিভাগে জনসংখ্যার অনুপাতে সংক্রমণের হারও উল্লেখযোগ্য ছিল; এরপর ঢাকা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহীতে উচ্চ সংক্রমণ হার রিপোর্ট করা হয়।

অর্থাৎ, হাম কোনো একটি শহর বা জেলার সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না; দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর বিস্তার দেখা গেছে।

কেন শিশুদের ঝুঁকি বেশি?

হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণের মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

প্রাদুর্ভাবের সময় আক্রান্তদের বড় অংশ ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। বিশেষ করে টিকা না নেওয়া বা টিকার পূর্ণ ডোজ না পাওয়া শিশুদের ঝুঁকি বেশি ছিল।

তাই শিশুর টিকাদান সম্পূর্ণ হয়েছে কি না যাচাই করা অভিভাবকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দেশজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি

সংক্রমণ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ জরুরি মিজলস-রুবেলা বা MR টিকাদান কর্মসূচি চালু করে। প্রাথমিক পর্যায়ে উচ্চঝুঁকির এলাকায় কর্মসূচি শুরু করার পর তা পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য এলাকায় সম্প্রসারণ করা হয়।

এ কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় এনে সংক্রমণের বিস্তার কমানো। দুর্গম এলাকা, নগরাঞ্চল, স্কুল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে শিশুদের টিকার আওতায় আনার জন্য বিভিন্ন কৌশলও গ্রহণ করা হয়।

হামের উপসর্গে সতর্কতা

হামের সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে—

  • জ্বর

  • কাশি

  • নাক দিয়ে পানি পড়া

  • চোখ লাল হওয়া

  • শরীরে লালচে ফুসকুড়ি

  • দুর্বলতা ও অস্বস্তি

শিশুর এসব উপসর্গ দেখা দিলে তাকে অন্য শিশুদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা, পানিশূন্যতা বা শিশুর অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

শুধু টিকা নয়, প্রয়োজন নজরদারিও

হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলোর একটি হলেও এর পাশাপাশি দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, আক্রান্ত ব্যক্তির যথাযথ ব্যবস্থাপনা, সংক্রমণ নজরদারি এবং হাসপাতালের প্রস্তুতিও জরুরি।

প্রাদুর্ভাবের সময় বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। ফলে ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোর আইসোলেশন ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী ও প্রশিক্ষিত জনবল প্রস্তুত রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষণ

২০২৬ সালের হাম পরিস্থিতি বাংলাদেশের টিকাদান ব্যবস্থায় উচ্চ কভারেজ ধরে রাখার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। নিয়মিত টিকাদানের কোনো পর্যায়ে শিশু বাদ পড়ে গেলে সময়ের সঙ্গে সেই জনগোষ্ঠীতে রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা কমে যেতে পারে।

প্রাদুর্ভাবের সময় জরুরি টিকাদান পরিস্থিতি সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী রাখা, বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করা এবং অভিভাবকদের সঠিক তথ্য দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য বা গুজব ছড়িয়ে পড়লে টিকা গ্রহণে অনীহা তৈরি হতে পারে। তাই স্বাস্থ্য বিভাগ, চিকিৎসক, শিক্ষক, স্থানীয় প্রশাসন ও অভিভাবকদের সমন্বিত সচেতনতা কার্যক্রম প্রয়োজন।

সম্ভাব্য ইতিবাচক দিক

  • টিকাদানের আওতা বাড়লে শিশুদের হাম থেকে সুরক্ষার সুযোগ বাড়বে।

  • দ্রুত রোগ শনাক্ত হলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।

  • দেশব্যাপী নজরদারি জোরদার হলে নতুন সংক্রমণ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

  • অভিভাবকদের মধ্যে টিকা ও শিশুস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়তে পারে।

  • স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর প্রস্তুতি বাড়লে ভবিষ্যৎ সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা সহজ হতে পারে।

সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক ও চ্যালেঞ্জ

  • টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ টিকাদান শিশুদের ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।

  • প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় সব শিশুকে সময়মতো টিকার আওতায় আনা কঠিন হতে পারে।

  • গুজব ও ভুল তথ্য টিকাদান কর্মসূচিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

  • সংক্রমণ হঠাৎ বেড়ে গেলে হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

  • নিয়মিত নজরদারিতে ঘাটতি থাকলে নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হতে দেরি হতে পারে।

অভিভাবকদের করণীয়

শিশুর টিকা কার্ড পরীক্ষা করে নির্ধারিত টিকা নেওয়া হয়েছে কি না নিশ্চিত করা উচিত। কোনো টিকা বাদ পড়ে থাকলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।

জ্বরের সঙ্গে কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে শিশুকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে দূরে রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

হাম প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো—সময়মতো টিকাদান, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সচেতনতা।

Post a Comment

0 Comments