বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে আরও ১১টি নতুন বিমান কেনার চুক্তি হয়েছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে এ চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, নতুন উড়োজাহাজের মধ্যে রয়েছে ৫টি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার এবং ৬টি বোয়িং ৭৩৭-৮। এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি করেছিল বিমান। ফলে নতুন চুক্তি যুক্ত হলে বোয়িংয়ের কাছ থেকে বিমানের মোট পরিকল্পিত উড়োজাহাজ সংগ্রহের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ২৫টি।
কেন বাড়ানো হচ্ছে বিমানের বহর?
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, দেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণ এবং নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর পরিকল্পনা বিবেচনায় নিয়েই নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাত সম্প্রসারিত হচ্ছে। নতুন নতুন রুট চালু করতে হলে পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ প্রয়োজন। তাই দেশের প্রয়োজন ও চাহিদার ভিত্তিতেই বিমান কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নতুন বহরে থাকছে ড্রিমলাইনার ও ৭৩৭-৮
বোয়িংয়ের সঙ্গে নতুন চুক্তির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো দুটি ভিন্ন শ্রেণির উড়োজাহাজ।
৫টি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার তুলনামূলক বড় ধারণক্ষমতার দীর্ঘপথের উড়োজাহাজ হিসেবে আন্তর্জাতিক রুটে ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্যদিকে ৬টি বোয়িং ৭৩৭-৮ একক-আইল উড়োজাহাজ, যা অপেক্ষাকৃত স্বল্প ও মাঝারি দূরত্বের রুটে ব্যবহারের উপযোগী।
ফলে নতুন বহরের মাধ্যমে বিমানের আন্তর্জাতিক রুট পরিচালনায় সক্ষমতা ও রুটভেদে উড়োজাহাজ ব্যবহারের নমনীয়তা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এর আগে ১৪ বিমানের চুক্তি
নতুন ১১ বিমানের চুক্তির আগে এপ্রিল মাসে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। ওই চুক্তির আওতায় ছিল ৮টি ৭৮৭-১০, ২টি ৭৮৭-৯ এবং ৪টি ৭৩৭-৮।
ওই ১৪টি উড়োজাহাজের মোট মূল্য ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং সেগুলো ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
মোট বহর কোথায় দাঁড়াতে পারে?
বিমান বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজ পরিচালনা করছে। বোয়িংয়ের ২৫টি এবং প্রস্তাবিত এয়ারবাসের আরও ১০টি উড়োজাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিমানের ভবিষ্যৎ উড়োজাহাজ সংগ্রহের পাইপলাইনে মোট ৩৫টি বিমান যুক্ত হতে পারে।
এয়ারবাসের সম্ভাব্য প্যাকেজে ৪টি এ৩৫০-৯০০ এবং ৬টি এ৩২১নিও উড়োজাহাজের কথা বলা হয়েছে। তবে এই অংশটি পৃথক প্রক্রিয়ার বিষয় এবং এর বাস্তবায়ন চূড়ান্ত চুক্তির ওপর নির্ভর করবে।
বিশ্লেষণ: নতুন বিমান কেনা বিমানের জন্য কী পরিবর্তন আনতে পারে?
বহর সম্প্রসারণের ফলে নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু, বিদ্যমান রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো এবং পুরোনো উড়োজাহাজ ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ও ৭৩৭-৮ একই নির্মাতার পরিবারের হওয়ায় প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যবস্থায় কিছু সামঞ্জস্য বজায় রাখার সুবিধা থাকতে পারে।
তবে শুধু নতুন উড়োজাহাজ কেনাই বিমানের আর্থিক সাফল্য নিশ্চিত করে না। নতুন বিমান কোন রুটে ব্যবহার হবে, যাত্রী চাহিদা কতটা থাকবে, পরিচালন ব্যয়, অর্থায়নের খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং উড়োজাহাজের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে বহর বড় হলে পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী ও রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে নতুন আন্তর্জাতিক রুটে পর্যাপ্ত যাত্রী ও কার্গো চাহিদা তৈরি করা গেলে বহর সম্প্রসারণের বাণিজ্যিক সুফল পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে।
বোয়িং-এয়ারবাস প্রতিযোগিতার মধ্যেও বহর সম্প্রসারণ
বাংলাদেশের উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনায় বোয়িংয়ের পাশাপাশি এয়ারবাসও আলোচনায় রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে বিমানকে একই সঙ্গে বহরের প্রয়োজন, পরিচালন দক্ষতা, অর্থায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বাণিজ্যিক সুবিধা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী বোয়িংয়ের ২৫টি উড়োজাহাজ এবং এয়ারবাসের সম্ভাব্য ১০টি উড়োজাহাজ যুক্ত হলে এটি বিমানের ইতিহাসে বড় ধরনের বহর সম্প্রসারণের একটি পর্যায় হতে পারে।
সামনে বড় প্রশ্ন—নতুন বিমান কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে?
বিমানের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু উড়োজাহাজ সংগ্রহ নয়; বরং এসব উড়োজাহাজকে লাভজনক ও কার্যকর রুটে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন রুট চালু, আন্তর্জাতিক সংযোগ বৃদ্ধি, প্রবাসী বাংলাদেশিদের যাতায়াত সহজ করা এবং পর্যটন ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন বহর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে দীর্ঘমেয়াদি রুট পরিকল্পনা, পরিচালন দক্ষতা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর।
সার্বিকভাবে, আরও ১১টি বোয়িং কেনার চুক্তি বিমানের বহর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় একটি বড় পদক্ষেপ। এখন নজর থাকবে—নতুন উড়োজাহাজগুলো কবে বহরে যুক্ত হয় এবং এগুলো ব্যবহার করে বিমান কতটা কার্যকরভাবে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করতে পারে।

0 Comments