Header Ads Widget

Responsive Advertisement

৬৪ আলোকবর্ষ দূরের গ্রহ থেকে রেডিও সংকেত, কী বলছেন বিজ্ঞানীরা?


সৌরজগতের বাইরে থাকা গ্যাসীয় দৈত্য বিটা পিক্টোরিস বি থেকে সরাসরি রেডিও তরঙ্গ শনাক্তের দাবি; সম্ভাব্য অরোরা ও শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়ার আশা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্কঃ

মহাকাশ গবেষণায় নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির দাবি করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। সৌরজগতের বাইরে থাকা একটি গ্রহ থেকে সরাসরি রেডিও সংকেত শনাক্ত করা হয়েছে বলে নতুন এক গবেষণায় জানানো হয়েছে। গ্রহটির নাম বিটা পিক্টোরিস বি (Beta Pictoris b)—একটি বিশাল গ্যাসীয় দৈত্য, যা পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৩–৬৪ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত।

এর আগে এক্সোপ্ল্যানেট বা সৌরজগতের বাইরের গ্রহকে ঘিরে রেডিও তরঙ্গ শনাক্তের ঘটনা ঘটলেও সেগুলোর উৎস গ্রহ নাকি তার নক্ষত্র—তা নিশ্চিতভাবে আলাদা করা সম্ভব হয়নি। এবার গবেষকেরা রেডিও সংকেতের অবস্থান বিশ্লেষণ করে সেটিকে সরাসরি বিটা পিক্টোরিস বি-এর সঙ্গে যুক্ত করার দাবি করছেন।

গবেষণায় দক্ষিণ আফ্রিকার MeerKAT রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করা হয়েছে। পর্যবেক্ষণে দ্রুতগতির ও পুনরাবৃত্ত রেডিও বিস্ফোরণের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত স্থায়ী রেডিও নিঃসরণও পাওয়া যায়। সংকেতের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা ধারণা করছেন, এর পেছনে গ্রহটির শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত অরোরা বা মেরুজ্যোতির ভূমিকা থাকতে পারে।

কেন এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ?

পৃথিবীতে মেরুজ্যোতি বা অরোরা তৈরি হয় যখন উচ্চশক্তির চার্জযুক্ত কণা গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্রের রেখা অনুসরণ করে বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে। একই ধরনের প্রক্রিয়া বিটা পিক্টোরিস বি-এর ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করছেন।

রেডিও নিঃসরণের ধরন থেকে গ্রহটির চৌম্বকক্ষেত্র সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। গবেষণাপত্রে বিটা পিক্টোরিস বি-এর চৌম্বকক্ষেত্রের উৎসস্থলে অন্তত প্রায় ১.২৫ কিলোগস মাত্রার চৌম্বকক্ষেত্র থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এক্সোপ্ল্যানেটের চৌম্বকক্ষেত্র সরাসরি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এলিয়েনের সংকেত কি?

রেডিও সংকেত শনাক্তের খবরটি শুনে ভিনগ্রহের প্রাণীর সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে এই সংকেত কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী বা কৃত্রিম প্রযুক্তি থেকে এসেছে।

গবেষকদের বর্তমান ব্যাখ্যা হলো, এটি একটি প্রাকৃতিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা—সম্ভবত গ্রহটির চৌম্বকক্ষেত্র ও নক্ষত্র থেকে আসা কণার মিথস্ক্রিয়ার ফলে তৈরি অরোরাল রেডিও নিঃসরণ।

গবেষণার বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সংকেতের উৎস শনাক্ত করা

এক্সোপ্ল্যানেট থেকে আসা রেডিও সংকেত শনাক্ত করার সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো—দূরবর্তী গ্রহ ও তার নক্ষত্রের সংকেতকে আলাদা করা। বিটা পিক্টোরিস ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও প্রথম পর্যবেক্ষণে সংকেতটি ঠিক কোথা থেকে আসছে, তা নিশ্চিত করা সহজ ছিল না।

গবেষকেরা দূরবর্তী কোয়াসারকে নির্দিষ্ট অবস্থান-চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করে রেডিও পর্যবেক্ষণের অবস্থানগত তথ্যের সঙ্গে গ্রহ ও নক্ষত্রের অবস্থান মিলিয়েছেন। এই পদ্ধতির মাধ্যমে সংকেতের উৎস গ্রহটির দিকে নির্দিষ্ট করার দাবি করা হয়েছে।

মহাকাশ গবেষণায় এর সম্ভাব্য প্রভাব

এক্সোপ্ল্যানেটের চৌম্বকক্ষেত্র একটি গ্রহের বায়ুমণ্ডল ও তার মহাকাশীয় পরিবেশ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র নক্ষত্রের কণাপ্রবাহের সঙ্গে গ্রহের মিথস্ক্রিয়া এবং বায়ুমণ্ডলের ওপর মহাকাশীয় পরিবেশের প্রভাব সম্পর্কে গবেষকদের নতুন তথ্য দিতে পারে।

বিটা পিক্টোরিস বি-এর মতো দূরবর্তী গ্রহ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা অন্যান্য এক্সোপ্ল্যানেটের চৌম্বকক্ষেত্র ও অরোরাল কার্যকলাপও শনাক্ত করার নতুন পদ্ধতি পেতে পারেন।

বিশ্লেষণ

এই আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু একটি দূরবর্তী গ্রহ থেকে রেডিও তরঙ্গ পাওয়া নয়; বরং সেই তরঙ্গের উৎসকে সরাসরি একটি এক্সোপ্ল্যানেটের সঙ্গে যুক্ত করার সক্ষমতা। এটি এক্সোপ্ল্যানেট গবেষণায় নতুন একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক দরজা খুলতে পারে।

তবে বিষয়টি এখনো গবেষণাধীন। সংশ্লিষ্ট গবেষণাটি একটি প্রিপ্রিন্ট হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে এবং ফলাফল আরও পর্যবেক্ষণ ও স্বাধীন যাচাইয়ের মাধ্যমে শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। তাই এটিকে ভিনগ্রহের প্রাণের সন্ধান বা কোনো কৃত্রিম বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।

বরং বৈজ্ঞানিকভাবে বড় প্রশ্ন হলো—দূরবর্তী গ্রহগুলোর চৌম্বকক্ষেত্র কীভাবে কাজ করে, নক্ষত্রের সঙ্গে তাদের মিথস্ক্রিয়া কতটা শক্তিশালী এবং সেই প্রক্রিয়া গ্রহের বায়ুমণ্ডলকে কীভাবে প্রভাবিত করে। বিটা পিক্টোরিস বি-এর রেডিও নিঃসরণ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।

Post a Comment

0 Comments