Header Ads Widget

Responsive Advertisement

দুই দেশের নতুন নিরাপত্তা সমঝোতা: ইরাককে বাশিকা সামরিক ঘাঁটি হস্তান্তর করবে তুরস্ক


ডেস্ক রিপোর্ট

উত্তর ইরাকে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করা তুরস্কের গুরুত্বপূর্ণ বাশিকা-জেলিকান সামরিক ঘাঁটি ধাপে ধাপে ইরাক সরকারের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে আঙ্কারা ও বাগদাদ। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের বৈঠকের পর দুই দেশ এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়।

এই সমঝোতার সঙ্গে শুধু একটি সামরিক ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের বিষয় জড়িত নয়; এর সঙ্গে উত্তর ইরাকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে)-সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি কমানো, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ও যুক্ত রয়েছে।

বাশিকা ঘাঁটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বাশিকা-জেলিকান ঘাঁটিটি ইরাকের উত্তরাঞ্চলে মসুলের কাছে অবস্থিত। ইসলামিক স্টেট বা আইএসের উত্থানের পর ২০১৫ সালে তুরস্ক সেখানে সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলে।

তুরস্কের বক্তব্য ছিল, আইএসবিরোধী লড়াইয়ে স্থানীয় বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি উত্তর ইরাকে নিজেদের নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষার জন্য এই সামরিক উপস্থিতি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাগদাদ শুরু থেকেই তুর্কি সেনাদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিল এবং এটিকে ইরাকের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

ফলে বাশিকা ঘাঁটি দীর্ঘদিন ধরে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব-সংক্রান্ত একটি স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে ছিল।

ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণ যাবে বাগদাদের হাতে

নতুন সমঝোতা অনুযায়ী, নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও সময়সূচি অনুসরণ করে তুরস্ক বাশিকা-জেলিকান ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ পর্যায়ক্রমে ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হস্তান্তরের সঙ্গে ইরাকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার বিষয়টিও যুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ ঘাঁটি হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি শুধু তুর্কি সেনা সরিয়ে নেওয়ার বিষয় নয়; উত্তর ইরাকে ইরাকি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও সক্রিয় করার একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।

তবে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে নির্দিষ্ট চূড়ান্ত প্রত্যাহারের তারিখ জানানো হয়নি। একটি ইরাকি সামরিক সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, প্রত্যাহারের ধাপগুলো বছরের শেষ নাগাদ সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।

সিনজারে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ

বাশিকা ঘাঁটি হস্তান্তরের পাশাপাশি ইরাক ও তুরস্ক সিনজার অঞ্চলে ইরাকি রাষ্ট্রের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং সেখানে নিষিদ্ধ বিদেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি বন্ধ করার বিষয়ে একমত হয়েছে।

সিনজার উত্তর-পশ্চিম ইরাকের একটি কৌশলগত এলাকা। অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্বার্থের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।

তুরস্ক বিশেষ করে পিকেকে এবং পিকেকে-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতিকে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। অন্যদিকে ইরাকও উত্তরাঞ্চলে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। নতুন সমঝোতায় দুই দেশের নিরাপত্তা স্বার্থকে একই কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

পিকেকে প্রসঙ্গেও পরিবর্তন

তুরস্ক ও পিকেকের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটাতে সাম্প্রতিক সময়ে একটি শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়েছে। এর ফলে তুরস্ক-ইরাক সীমান্তবর্তী এলাকায় সশস্ত্র তৎপরতা কমানোর নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো মনে করছে।

এরই ধারাবাহিকতায় সিনজার এলাকায় পিকেকে-সংশ্লিষ্ট কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্র ত্যাগ এবং যোগ্য সদস্যদের ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগের কথাও সামনে এসেছে।

এই পরিবর্তন বাস্তবে কার্যকর হলে উত্তর ইরাকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বাগদাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে এবং তুরস্কেরও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে কিছু উদ্বেগ কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সামরিক সমঝোতার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কও জড়িত

ইরাক ও তুরস্ক শুধু নিরাপত্তা ইস্যুতে নয়, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়েও একমত হয়েছে।

দুই দেশের নেতারা আগে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বিশেষ করে ‘ডেভেলপমেন্ট রোড’ নামে পরিচিত কৌশলগত অবকাঠামো প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ইরাককে উপসাগরীয় অঞ্চল ও তুরস্কের মাধ্যমে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে নতুন পরিবহন ও বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হতে পারে। ফলে সামরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক যোগাযোগও দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

কেন এখন এই সমঝোতা?

বর্তমান পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে।

প্রথমত, ইরাক উত্তরাঞ্চলে কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। দ্বিতীয়ত, তুরস্ক সীমান্তের কাছে পিকেকে-সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম কমাতে চাইছে। তৃতীয়ত, দুই দেশই বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে।

এর পাশাপাশি ইরাক থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি শেষ হওয়ার সময়ের সঙ্গেও তুরস্কের বাশিকা ঘাঁটি হস্তান্তরের সমঝোতা প্রায় একই সময়ে সামনে এসেছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মার্কিন সেনাদের ইরাক থেকে চূড়ান্ত প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে। ফলে উত্তর ইরাকের নিরাপত্তা কাঠামো নতুনভাবে সাজানোর বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Post a Comment

0 Comments