Header Ads Widget

Responsive Advertisement

প্রায় ২০০ বছর পর টেনেসিতে নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর: ৩০ বছরের পুরোনো মামলায় চূড়ান্ত পরিণতি


ডেস্ক রিপোর্ট

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে প্রায় দুই শতাব্দীর মধ্যে প্রথমবারের মতো একজন নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ৫০ বছর বয়সী ক্রিস্টা গেইল পাইককে ১৯৯৫ সালে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ডের দায়ে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা রয়েছে। নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে এলেও তার আইনজীবীরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দণ্ড স্থগিতের জন্য আইনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

পাইক যখন অপরাধটি করেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। মামলাটি প্রায় তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ডবিষয়ক বিতর্কের একটি আলোচিত উদাহরণ হয়ে রয়েছে। তার সমর্থকেরা বয়স, শৈশবের নির্যাতন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ইতিহাস বিবেচনার দাবি তুলেছেন। অন্যদিকে নিহত তরুণীর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচারের দাবিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

১৯৯৫ সালের সেই হত্যাকাণ্ড

মামলার নথি ও আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে টেনেসির নক্সভিল এলাকায় ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমারকে একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পাইক, তার তৎকালীন প্রেমিক ট্যাডারিল শিপ এবং আরেক কিশোরী জড়িত ছিলেন।

প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, স্লেমারকে মারধর ও নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতার কারণে ঘটনাটি সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। মামলাটিতে হত্যার সঙ্গে একটি পেন্টাগ্রাম চিহ্নের বিষয়ও উঠে আসে, যা ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকের তথাকথিত ‘সেটানিক প্যানিক’-এর আবহে ঘটনাটিকে আরও আলোচিত করে তোলে।

পাইক হত্যাকাণ্ডে নিজের ভূমিকা অস্বীকার করেননি। আদালতের রায়ে হত্যার ধরন ও পরিস্থিতিকে গুরুতর অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

একই ঘটনায় অন্য আসামির শাস্তি কেন আলাদা?

এই মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের সবার শাস্তি এক হয়নি।

পাইকের তৎকালীন প্রেমিক ট্যাডারিল শিপের বয়স ছিল ১৭ বছর। ফলে অপরাধের সময় তার বয়স ১৮ বছরের নিচে হওয়ায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি; তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং ভবিষ্যতে প্যারোলের সুযোগ রয়েছে। মামলার তৃতীয় কিশোরী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করে পাইক ও শিপের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন এবং তিনি প্রবেশন পান।

এ কারণে পাইকের মামলা যুক্তরাষ্ট্রে কিশোর বয়সের শেষ পর্যায়ে সংঘটিত অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের সীমা ও প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

১৮ বছর বয়সের বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

পাইকের আইনজীবীদের অন্যতম যুক্তি হলো—অপরাধের সময় তার বয়স ছিল ১৮ বছর। যদিও আইনগতভাবে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন, আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান ও অপরাধবিচারসংক্রান্ত গবেষণায় কৈশোর ও তরুণ বয়সের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে নতুন ধারণা তৈরি হয়েছে।

তার আইনজীবীরা আদালতে আরও যুক্তি দিয়েছেন যে, পাইকের শৈশব ও কৈশোর দীর্ঘস্থায়ী নির্যাতন, অবহেলা এবং যৌন সহিংসতার মধ্য দিয়ে কেটেছে। তাদের মতে, এসব অভিজ্ঞতা তার আচরণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনের প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এসব যুক্তি মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করেনি। আদালতগুলোতে তার দণ্ড বহাল রয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া এগিয়েছে।

শৈশবের নির্যাতনের বিষয়টি আবার সামনে

পাইকের আইনজীবীরা তার পক্ষে দাখিল করা ক্ষমার আবেদনে তার শৈশবের গুরুতর নির্যাতন ও অবহেলার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই তিনি একাধিক ধরনের নির্যাতনের শিকার হন এবং পর্যাপ্ত সুরক্ষা ও সহায়তা পাননি।

জাতিসংঘের কয়েকজন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন সংগঠনও তার মৃত্যুদণ্ড স্থগিত বা শাস্তি কমানোর আহ্বান জানিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে অপরাধের সময় তার বয়স এবং তার জীবনব্যাপী নির্যাতনের ইতিহাস।

তবে এসব বক্তব্যের বিপরীতে নিহত কলিন স্লেমারের পরিবারের পক্ষ থেকেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পক্ষে অবস্থান জানানো হয়েছে। ফলে মামলাটি একদিকে অপরাধের দায় ও শাস্তির প্রশ্ন, অন্যদিকে অপরাধীর বয়স ও অতীতের পরিস্থিতি বিবেচনার প্রশ্ন—দুই দিকের বিতর্ক সামনে এনেছে।

শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আইনি প্রচেষ্টা

নির্ধারিত মৃত্যুদণ্ডের আগে পাইকের আইনজীবীরা বিভিন্ন আদালতে দণ্ড স্থগিতের চেষ্টা করেছেন। টেনেসির আদালতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

তার আইনজীবীরা প্রাণঘাতী ইনজেকশন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য জটিলতার কথা উল্লেখ করেছেন এবং তার শারীরিক অবস্থার কারণে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। টেনেসির আদালত অবশ্য রাজ্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রটোকলকে সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য বলে অনুমোদন দিয়েছে।

গভর্নর বিল লিও পাইকের ক্ষমার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথে বড় ধরনের প্রশাসনিক বাধা আর অবশিষ্ট নেই, যদিও তার আইনজীবীদের আইনি প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

কেন প্রায় ২০০ বছর পর এই ঘটনা?

টেনেসিতে এর আগে সর্বশেষ কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘটেছিল প্রায় দুই শতাব্দী আগে। ফলে পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে এটি হবে অঙ্গরাজ্যটির আধুনিক যুগে নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের একটি বিরল ঘটনা এবং প্রায় ২০০ বছরের ব্যবধানের পর প্রথম এমন ঘটনা।

যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটেও নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল। ১৯৭৬ সালে দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহালের পর এখন পর্যন্ত অল্পসংখ্যক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ড নিয়ে পুরোনো বিতর্ক আবার সামনে

পাইকের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে প্রশ্ন উঠেছে—অপরাধ সংঘটনের সময় একজন ব্যক্তির বয়স, তার মানসিক ও সামাজিক বিকাশ এবং শৈশবের নির্যাতনের ইতিহাস মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে কতটা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

এক পক্ষের বক্তব্য, গুরুতর ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে অপরাধের দায় এবং নিহত ব্যক্তির পরিবারের ন্যায়বিচারের অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যদিকে মানবাধিকার ও ফৌজদারি বিচার সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত পক্ষগুলো বলছে, তরুণ বয়সে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে ব্যক্তির বিকাশ, অতীতের নির্যাতন এবং পুনর্বাসনের সম্ভাবনাও বিচারপ্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাইকের মামলায় এই দুই দৃষ্টিভঙ্গিই স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।

Post a Comment

0 Comments