Header Ads Widget

Responsive Advertisement

ভয়াবহ হাম পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশে ৩৪ লাখ শিশুকে টিকাদান শুরু


টিকাদান কর্মসূচিতে বাদ পড়া ও নতুন করে টিকা পাওয়ার উপযোগী শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে; এক মাসের বিশেষ অভিযানে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য

স্বাস্থ্য ডেস্কঃ

বাংলাদেশে ভয়াবহ হাম পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে দেশব্যাপী বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।

বিশেষ এই কর্মসূচিতে মূলত ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে আগের টিকাদান কর্মসূচিতে বাদ পড়া প্রায় ২৪ লাখ শিশু এবং সম্প্রতি ৬ মাস বয়স পূর্ণ করা প্রায় ১০ লাখ শিশু রয়েছে। কর্মসূচিটি ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে।

ভয়াবহ সংক্রমণের মধ্যে নতুন উদ্যোগ

চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশে হাম সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সর্বশেষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চের পর থেকে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার সন্দেহভাজন হাম আক্রান্তের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২১ হাজারের বেশি সংক্রমণ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে এবং হাম-সংশ্লিষ্ট নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আগের মূল্যায়নেও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক সংক্রমণ ও টিকাদানে ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছিল। সংস্থাটি জানিয়েছিল, আক্রান্তদের বড় অংশ শিশু এবং টিকা না নেওয়া বা পর্যাপ্ত টিকা না পাওয়া শিশুদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি।

কেন ৩৪ লাখ শিশুকে আবার টিকার আওতায় আনা হচ্ছে?

স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো আগের টিকাদান কার্যক্রমে যেসব শিশু কোনো কারণে বাদ পড়েছে, তাদের খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনা।

এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া বিভিন্ন জরুরি ও পরবর্তী টিকাদান কর্মসূচিতে ইতোমধ্যে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে পরবর্তী পর্যায়ের কার্যক্রমে আরও বিপুলসংখ্যক শিশু টিকাদানের বাইরে থাকার বিষয়টি সামনে আসে। ফলে নতুন করে ‘ক্যাচ-আপ’ কর্মসূচির মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বয়সসীমা কমানোর কারণ

সাধারণ টিকাদান সূচিতে হাম প্রতিরোধী টিকা দেওয়ার বয়সসীমার তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতিতে ৬ মাস বয়স থেকেই কিছু শিশুকে বিশেষ কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে।

এর পেছনে রয়েছে চলমান সংক্রমণের ঝুঁকি। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানের সুযোগ পাওয়ার আগেই কিছু শিশু হাম আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে সংক্রমণের পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ বয়সী শিশুদের দ্রুত সুরক্ষার আওতায় আনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

টিকাদানে ঘাটতি কীভাবে সংকট বাড়িয়েছে?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিভিন্ন ধরনের বিঘ্ন, টিকা সরবরাহের সমস্যা এবং কিছু কর্মসূচি পিছিয়ে যাওয়া বা বাতিল হওয়ার ফলে অনেক শিশু পর্যাপ্ত সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

ফলে সময়ের সঙ্গে টিকা না পাওয়া বা আংশিক টিকা পাওয়া শিশুদের একটি বড় জনগোষ্ঠী তৈরি হয়। হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় এই ধরনের ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হলে অল্প সময়ের মধ্যেই সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

শুধু টিকা দিলেই কি সংকট পুরোপুরি কাটবে?

বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় উঠে এসেছে, টিকাদানের পাশাপাশি আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, সংক্রমিত রোগীর যথাযথ ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি জোরদার করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হাম নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে অন্তত ৯৫ শতাংশ কভারেজ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পাশাপাশি রোগ শনাক্তকরণ, নজরদারি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাও শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

নতুন কর্মসূচির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাদ পড়া প্রতিটি শিশুকে শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা। কারণ কোনো এলাকায় টিকাদানের হার কম থাকলে সেখানে সংক্রমণের চেইন অব্যাহত থাকার ঝুঁকি থাকে।

এ ছাড়া হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ, প্রত্যন্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় টিকাদান পৌঁছে দেওয়া এবং অভিভাবকদের সচেতনতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে হাম নিয়ন্ত্রণে চলমান বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি মূলত অতীতে তৈরি হওয়া টিকাদান ঘাটতি পূরণের একটি বড় উদ্যোগ। প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে নতুন করে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা দেখাচ্ছে যে, শুধু আগের কর্মসূচির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করাই যথেষ্ট নয়—বাস্তবে কতজন শিশু টিকা পেয়েছে, সেটিও নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বর্তমান সংকট দীর্ঘমেয়াদে মোকাবিলার জন্য নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখা, টিকা সরবরাহে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং সংক্রমণের হটস্পটগুলোতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানের মাধ্যমে জনগোষ্ঠীর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি পূরণ করা গেলে ভবিষ্যতে এমন বড় আকারের সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

Post a Comment

0 Comments