বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
পৃথিবীকে আমরা একটি স্থির ও নিখুঁত গোলকের মতো ভাবলেও এর ভেতরের ও ওপরের ভরবণ্টন সবসময় পরিবর্তিত হচ্ছে। সমুদ্রের পানি, বৃষ্টিপাত, তুষার, বরফ এবং বায়ুমণ্ডলের ভর এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর ভরকেন্দ্র বা ‘জিওসেন্টার’ও সামান্য স্থান পরিবর্তন করে।
নাসার গবেষকদের নতুন বিশ্লেষণে এই মৌসুমি পরিবর্তনের পরিমাণ আগের কিছু হিসাবের তুলনায় কম হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। নতুন হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের মৌসুমি স্থানচ্যুতি প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৫ মিলিমিটার মাত্রার হতে পারে।
কেন নড়ছে পৃথিবীর ভরকেন্দ্র?
পৃথিবীর ভরকেন্দ্র বলতে এমন একটি ভারসাম্য বিন্দুকে বোঝায়, যেখানে পৃথিবীর কঠিন অংশ, পানি ও বায়ুমণ্ডলের মোট ভরকে গাণিতিকভাবে বিবেচনা করা হয়।
কিন্তু পৃথিবীর পানি ও বায়ু স্থির নয়। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলে তুষার জমে, বরফ গলে, বৃষ্টিপাত বাড়ে এবং সমুদ্র ও স্থলভাগে পানির পরিমাণ পরিবর্তিত হয়।
ফলে পৃথিবীর মোট ভর একই থাকলেও ভর কোথায় কী পরিমাণে রয়েছে—সেটি বদলে যায়। আর সেই পরিবর্তনের কারণেই ভরকেন্দ্র সামান্য এদিক-ওদিক সরে যায়।
কয়েক মিলিমিটার পরিবর্তন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কয়েক মিলিমিটারের এই পরিবর্তন প্রায় অনুভবই করা সম্ভব নয়। কিন্তু মহাকাশভিত্তিক অবস্থান নির্ণয় ও ভূ-পরিমাপের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
স্যাটেলাইটের কক্ষপথ নির্ণয়, অত্যন্ত নির্ভুল GPS/GNSS অবস্থান নির্ধারণ এবং পৃথিবীর পৃষ্ঠের উচ্চতা মাপার মতো কাজে পৃথিবীর একটি নির্ভুল রেফারেন্স ফ্রেম প্রয়োজন।
সেই রেফারেন্স ব্যবস্থায় পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের অবস্থান সম্পর্কে সামান্য পরিবর্তনও হিসাবের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হয়। বিশেষ করে সেন্টিমিটার বা মিলিমিটার-স্তরের নির্ভুলতা প্রয়োজন এমন প্রযুক্তিতে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আগের হিসাবের তুলনায় নতুন তথ্য
গবেষকদের বিশ্লেষণে পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের মৌসুমি গতিবিধির প্রচলিত হিসাবের তুলনায় কম হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এর আগে প্রায় ১১ মিলিমিটার পর্যন্ত পরিবর্তনের একটি প্রচলিত হিসাব ব্যবহৃত হতো। নতুন বিশ্লেষণে তা আনুমানিক ৪ থেকে ৫.৫ মিলিমিটার হতে পারে বলে উঠে এসেছে।
গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, আগের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাবের মধ্যেও পার্থক্য ছিল। নতুন পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ সেই অনিশ্চয়তা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
কোথা থেকে আসে এই পরিবর্তন?
বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে কয়েকটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তুষারপাত: উত্তর গোলার্ধের বিভিন্ন অঞ্চলে শীতকালে বিপুল পরিমাণ তুষার জমা হলে পৃথিবীর ভরবণ্টনে পরিবর্তন আসে।
বৃষ্টিপাত ও নদীর পানি: মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে বিশাল পরিমাণ পানি স্থলভাগে জমা হয় এবং পরে নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির মাধ্যমে অন্যত্র সরে যায়।
বরফ ও হিমবাহ: বরফ জমা ও গলার প্রক্রিয়াও পৃথিবীর ভরবণ্টনে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন ঘটায়।
বায়ুমণ্ডল ও সমুদ্র: বাতাসের চাপ ও সমুদ্রের পানির মৌসুমি বণ্টনও পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের অবস্থানে সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
GPS কি তাহলে ভুল দেখাবে?
এই গবেষণার অর্থ এই নয় যে সাধারণ মানুষের স্মার্টফোনের GPS হঠাৎ করে অকার্যকর হয়ে যাবে।
বরং বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চ-নির্ভুলতার স্যাটেলাইট নেভিগেশন, জিওডেসি, ভূ-পরিমাপ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে। এসব কাজে কয়েক মিলিমিটার বা সেন্টিমিটারের পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
অর্থাৎ, পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের এই স্বাভাবিক মৌসুমি পরিবর্তনকে নেভিগেশন ও ভূ-পরিমাপের উন্নত মডেলগুলোতে যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পৃথিবী সম্পর্কে নতুন কী জানাচ্ছে এই গবেষণা?
পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের নড়াচড়া দেখিয়ে দেয়, আমাদের গ্রহ আসলে একটি সম্পূর্ণ স্থির ব্যবস্থা নয়। জলবায়ু, পানি, বরফ, সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের ক্রমাগত পরিবর্তন পৃথিবীর ভৌত বৈশিষ্ট্যেও সূক্ষ্ম প্রভাব ফেলে।
এই ধরনের গবেষণা শুধু GPS বা স্যাটেলাইট নেভিগেশনকে আরও নির্ভুল করতেই সহায়তা করে না; বরং পৃথিবীর পানি ও বরফের বৈশ্বিক বণ্টন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
এক নজরে
পৃথিবীর ভরকেন্দ্র: স্থির নয়, মৌসুমভেদে সামান্য স্থান পরিবর্তন করে
নতুন হিসাব: প্রায় ৪–৫.৫ মিলিমিটার মাত্রার মৌসুমি পরিবর্তন
মূল কারণ: পানি, তুষার, বরফ ও বায়ুমণ্ডলের ভরবণ্টনের পরিবর্তন
প্রভাব: উচ্চ-নির্ভুলতার GPS/GNSS ও স্যাটেলাইট-ভিত্তিক পরিমাপে গুরুত্বপূর্ণ
সাধারণ GPS: দৈনন্দিন ব্যবহারে বড় ধরনের তাৎক্ষণিক বিপর্যয়ের অর্থ নয়
গুরুত্ব: পৃথিবীর ভৌত পরিবর্তন ও সুনির্দিষ্ট ভূ-পরিমাপ আরও ভালোভাবে বোঝা

0 Comments