বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
রাতের আকাশে পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত সঙ্গী চাঁদ। কিন্তু এই উপগ্রহের জন্ম কীভাবে হয়েছিল—এ প্রশ্নের পুরোপুরি নিশ্চিত উত্তর এখনো বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। প্রচলিত ‘জায়ান্ট ইমপ্যাক্ট’ বা বিশাল সংঘর্ষ তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর সঙ্গে মঙ্গলগ্রহের কাছাকাছি আকারের একটি প্রোটোপ্ল্যানেটের সংঘর্ষে চাঁদের জন্ম হয়।
সেই কাল্পনিক গ্রহটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘থিয়া’ (Theia)। নতুন গবেষণা এই তত্ত্বে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গবেষকদের বিশ্লেষণ বলছে, থিয়া হয়তো সৌরজগতের দূরবর্তী কোনো অঞ্চল থেকে আসা অপরিচিত বস্তু ছিল না; বরং প্রাচীন পৃথিবীর খুব কাছাকাছি অঞ্চলে গড়ে ওঠা এক ধরনের মহাজাগতিক প্রতিবেশী হতে পারে।
কীভাবে জন্ম হতে পারে চাঁদের?
বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবী যখন সৌরজগতের শুরুর দিকে গঠিত হচ্ছিল, তখন এর আশপাশেও বিভিন্ন প্রোটোপ্ল্যানেট বা গ্রহের ভ্রূণ ঘুরছিল। এর মধ্যে মঙ্গল-আকারের একটি বস্তু পৃথিবীর সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
সেই সংঘর্ষে দুই গ্রহীয় বস্তুর বিপুল পরিমাণ পদার্থ মহাশূন্যে ছিটকে যায়। পরবর্তী সময়ে সেই ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীর কক্ষপথে একত্রিত হয়ে চাঁদ গঠন করে—এটাই জায়ান্ট ইমপ্যাক্ট তত্ত্বের মূল ধারণা।
তবে বড় প্রশ্ন ছিল—থিয়া আসলে কোথা থেকে এসেছিল?
পৃথিবীর ‘পাশের বাড়ির’ গ্রহ ছিল থিয়া?
ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর সোলার সিস্টেম রিসার্চের গবেষকদের নতুন বিশ্লেষণে পৃথিবী, চাঁদ এবং কাছাকাছি পাওয়া বিভিন্ন উল্কাপিণ্ডের রাসায়নিক ও আইসোটোপীয় বৈশিষ্ট্য তুলনা করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, পৃথিবী ও চাঁদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইসোটোপের গঠন অত্যন্ত কাছাকাছি। বিশেষ করে লোহার আইসোটোপের ক্ষেত্রেও তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল পাওয়া গেছে। অন্যদিকে পৃথিবীর কাছাকাছি অঞ্চলের কিছু উল্কাপিণ্ডে ভিন্ন ধরনের আইসোটোপীয় বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।
এই পার্থক্য থেকেই গবেষকরা ধারণা করছেন, থিয়া যদি সৌরজগতের অন্য কোনো দূরবর্তী অঞ্চল থেকে এসে পৃথিবীর সঙ্গে সংঘর্ষ করত, তাহলে তার উপাদানে আরও স্পষ্ট পার্থক্য থাকার কথা। কিন্তু পৃথিবী ও চাঁদের রাসায়নিক সাদৃশ্য ইঙ্গিত দিতে পারে যে থিয়া পৃথিবীর কাছাকাছি একই ধরনের উপাদান থেকে গঠিত হয়েছিল।
চাঁদ ও পৃথিবীর উপাদানে এত মিল কেন?
চাঁদের উৎপত্তি নিয়ে সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক ধাঁধাগুলোর একটি হলো পৃথিবী ও চাঁদের উপাদানের অসাধারণ সাদৃশ্য।
আগের গবেষণাতেও পৃথিবী ও চাঁদের অক্সিজেন আইসোটোপে উল্লেখযোগ্য মিল পাওয়া গেছে। নতুন গবেষণায় লোহা ও অন্যান্য ধাতব আইসোটোপের দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা হলো, পৃথিবী ও থিয়া যদি একই মহাজাগতিক উপাদানভাণ্ডার থেকে তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে তাদের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে এমন মিল থাকা সম্ভব।
অর্থাৎ, থিয়া হয়তো পৃথিবীর একেবারে ‘দূরের অতিথি’ ছিল না—বরং একই মহাজাগতিক এলাকায় তৈরি হওয়া প্রতিবেশী গ্রহীয় বস্তু হতে পারে।
তবে চাঁদের জন্মের রহস্য এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি
নতুন গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিলেও এটিকে চাঁদের উৎপত্তির চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
চাঁদ ঠিক কীভাবে তৈরি হয়েছিল, সংঘর্ষের সময় পৃথিবী ও থিয়ার পদার্থ কীভাবে মিশেছিল এবং সেই প্রক্রিয়ায় চাঁদের বর্তমান গঠন কীভাবে তৈরি হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও কম্পিউটার সিমুলেশন ও মডেলিং প্রয়োজন।
গবেষকদের মতে, পৃথিবী ও থিয়ার সংঘর্ষের পর দুই গ্রহের উপাদান কীভাবে এতটা সমজাতীয় হয়ে উঠেছিল, সেই প্রক্রিয়াটিও এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
চাঁদের জন্ম নিয়ে কেন এত গবেষণা?
চাঁদের উৎপত্তি বোঝা শুধু একটি উপগ্রহের ইতিহাস জানার বিষয় নয়। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা পৃথিবী ও সৌরজগতের শৈশবকাল, গ্রহ গঠনের প্রক্রিয়া এবং প্রাচীন সৌরজগতের গতিশীলতা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পেতে পারেন।
প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগের সেই মহাজাগতিক সংঘর্ষের ঘটনা যদি সত্যিই চাঁদের জন্মের মূল কারণ হয়ে থাকে, তাহলে পৃথিবীর বর্তমান প্রতিবেশী চাঁদ আসলে আমাদের গ্রহের প্রাচীন ইতিহাসেরই একটি অংশ বহন করছে।
এক নজরে
চাঁদের বয়স: প্রায় ৪৫০ কোটি বছর
প্রধান তত্ত্ব: পৃথিবীর সঙ্গে বিশাল গ্রহীয় সংঘর্ষ
কাল্পনিক সংঘর্ষকারী: মঙ্গল-আকারের প্রোটোপ্ল্যানেট ‘থিয়া’
নতুন গবেষণার ইঙ্গিত: থিয়া হয়তো পৃথিবীর কাছাকাছি অঞ্চলে গঠিত হয়েছিল
গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ: পৃথিবী ও চাঁদের আইসোটোপীয় গঠনে শক্তিশালী সাদৃশ্য
অমীমাংসিত প্রশ্ন: সংঘর্ষের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও চাঁদ গঠনের পূর্ণাঙ্গ মডেল

0 Comments