অস্ট্রেলিয়ার জনমিতিক চিত্র আগামী কয়েক দশকে বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে পারে। ২০৬০-এর দশকে দেশটিতে প্রতিবছর জন্ম নেওয়া মানুষের চেয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হয়ে যেতে পারে। এর ফলে অভিবাসন অব্যাহত না থাকলে ওই সময় থেকে অস্ট্রেলিয়ার মোট জনসংখ্যা কমতে শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে।
সর্বশেষ ইন্টারজেনারেশনাল রিপোর্টে অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও সরকারি ব্যয়ের ওপর এই পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। কমে যাওয়া জন্মহার ও মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে দেশটির জনসংখ্যা ধীরে ধীরে বয়স্ক হয়ে উঠছে।
বাড়ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর চাপ
জনসংখ্যার বয়স কাঠামো পরিবর্তনের ফলে কর্মক্ষম মানুষের তুলনায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়বে। বিশেষ করে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের অনুপাত বৃদ্ধির ফলে স্বাস্থ্যসেবা, পরিচর্যা ও সামাজিক নিরাপত্তায় সরকারি ব্যয়ের চাপ বাড়তে পারে।
এ ক্ষেত্রে আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আগামী কয়েক দশকে ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা এবং এজড কেয়ার বা প্রবীণ পরিচর্যা খাতে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হতে পারে।
কর্মক্ষম মানুষের তুলনায় প্রবীণ বেশি হলে কী হবে?
জনসংখ্যার বার্ধক্যের সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে শ্রমবাজার ও সরকারি অর্থব্যবস্থায়। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তুলনায় অবসরপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা বাড়লে তুলনামূলক কমসংখ্যক কর্মজীবী মানুষের ওপর স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন ও অন্যান্য সরকারি ব্যয়ের চাপ বাড়বে।
দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও কঠিন হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অভিবাসন
কম জন্মহারের প্রভাব সামাল দিতে অভিবাসনকে অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যান্য অনেক উন্নত অর্থনীতির তুলনায় অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা এখনো তুলনামূলকভাবে তরুণ।
দক্ষ অভিবাসন কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়াতে এবং জনসংখ্যার বার্ধক্যের গতি কিছুটা কমাতে সহায়তা করছে। তবে ভবিষ্যতে জন্মহার কমতে থাকলে শুধু অভ্যন্তরীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
বছরে ২ লাখ ৩৫ হাজার নিট অভিবাসনের প্রয়োজন হতে পারে
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক স্বরাষ্ট্রসচিব মাইক পেজুলো দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যার ভারসাম্য বজায় রাখতে বছরে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার মানুষের নিট বৈদেশিক অভিবাসন প্রয়োজন হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন।
তার মতে, কর্মক্ষম মানুষের তুলনায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অনুপাত বেশি বেড়ে গেলে সরকারি বাজেটের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হতে পারে। পর্যাপ্ত নিট অভিবাসন দীর্ঘমেয়াদে সেই চাপ সীমিত রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
অভিবাসন কমানোর দাবিও জোরালো
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনের মাত্রা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও চলছে। রাজনৈতিক দল ‘ওয়ান নেশন’ অভিবাসন উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের পরিকল্পনায় প্রথম কয়েক বছর নিট অভিবাসন ঋণাত্মক করার পর বছরে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার নিট বৈদেশিক অভিবাসনের সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
ফেডারেল সরকারও অভিবাসনের চাপ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, ২০২৭–২৮ অর্থবছরের মধ্যে নিট বৈদেশিক অভিবাসন ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনা। সরকারের যুক্তি হলো দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে আবাসন, অবকাঠামো ও জনসেবার সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা প্রয়োজন।
জন্মহার কমা নিয়ে উদ্বেগ
অস্ট্রেলিয়ার কোষাগারবিষয়ক মন্ত্রী জিম চালমার্স দেশটির কমে যাওয়া জন্মহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, কয়েক বছর আগের তুলনায় জন্মহারে পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক প্রবণতায় পরিণত হয়েছে।
তবে তার বক্তব্য অনুযায়ী, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে যে ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ায় জন্মের চেয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও কয়েক দশক সময় লাগতে পারে।
সামনে বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ
অস্ট্রেলিয়ার সামনে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে নতুন এক জনমিতিক বাস্তবতা—জন্মহার কমছে, মানুষের আয়ু বাড়ছে এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব সামাল দিতে অভিবাসননীতি, কর্মশক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন এবং সরকারি ব্যয়ের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য তৈরি করা আগামী কয়েক দশকে দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

0 Comments