রাজনৈতিক ডেস্কঃ
পুলিশ হেফাজত ও কারাগারে থাকার সময় ‘চরম নির্যাতনের’ শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব গাজী সালাহউদ্দিন তানভীর।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, হেফাজতে থাকা অবস্থায় তাকে বহুবার ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ৭০ থেকে ৮০টি ইনজেকশন দেওয়ার কথা তিনি উল্লেখ করেন।
তানভীরের এসব বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও তার অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অসুস্থতার সময় বারবার ইনজেকশনের দাবি
তানভীরের অভিযোগ, হেফাজতে থাকা অবস্থায় তার দীর্ঘ সময় জ্বর ছিল এবং বিভিন্ন সময়ে তাকে ইনজেকশন দেওয়া হতো।
তিনি বলেন, একদিন হাত-পা কাঁপতে শুরু করলে একজন চিকিৎসক তাকে ইনজেকশন দেন। এরপর তার ডান হাত ও ডান পা অবশ হয়ে যায় বলে দাবি করেন তিনি।
পরে তাকে বগুড়ার শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তানভীরের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে একজন চিকিৎসক তাকে স্ট্রোক হয়েছে বলে জানান। তবে কারা কর্তৃপক্ষ সেই রোগনির্ণয় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
‘পচা খাবার ও অজ্ঞাত ওষুধ দেওয়া হয়েছে’
কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু হয় বলে অভিযোগ করেন তানভীর।
তার দাবি, অন্যদের তুলনায় তাকে দুই দিন আগের বাসি বা নষ্ট খাবার দেওয়া হতো। এর ফলে তিনি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন বলেও জানান।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ না দিয়ে প্যাকেটবিহীন অজ্ঞাত ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে—এমন অভিযোগও করেন তিনি।
তানভীর আরও দাবি করেন, তার সিটি স্ক্যান করা হলেও ফলাফল তাকে জানানো হয়নি। পরে এমআরআই করার সময় মেশিন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি কোমর থেকে নিচের অংশ অবশ হয়ে যাওয়ার অনুভূতি পান বলে জানান।
সাদা পোশাকধারীদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ
কারাগার থেকে চিকিৎসা শেষে ফেরার পথে কয়েকজন সাদা পোশাকের ব্যক্তি কারাগারের গাড়িতে উঠে তাকে নির্যাতন করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তানভীর।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিদের একজন বসুন্ধরা গ্রুপের নাম উল্লেখ করে তাকে প্রশ্ন করেন এবং প্রতিষ্ঠানের মালিক ও তার পরিবারের সদস্যদের প্রসঙ্গ তোলেন।
তবে ওই ব্যক্তিরা কারা ছিলেন বা তাদের সঙ্গে উল্লিখিত ব্যক্তিদের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না—এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে তানভীর কোনো স্বাধীন প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
‘অন্ধকার কক্ষে’ নেওয়ার অভিযোগ
তানভীর আরও অভিযোগ করেন, তাকে একাধিকবার কারাকক্ষ থেকে একটি অন্ধকার কক্ষে নিয়ে যাওয়া হতো এবং সেখানে নির্যাতন করা হতো।
তার দাবি, নির্যাতনের সময় কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাকে ভয় দেখানো হয়। এমনকি ‘জুলাই’ আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যদেরও একই ধরনের পরিণতির হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এসব অভিযোগেরও স্বাধীন যাচাই এখনো হয়নি।
কী মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তানভীর?
এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর ও মানহানিকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে সাইবার নিরাপত্তা আইনে করা মামলায় গত ৫ আগস্ট ঢাকার পূর্ব মনিপুর এলাকা থেকে তানভীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলাটি ২ আগস্ট বগুড়া সদর থানায় করেন বিএনপির বগুড়া সদর থানা ইউনিটের সভাপতি এইচএস মাফতুন আহমেদ খান। পরে তাকে বগুড়ায় নিয়ে গিয়ে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
এর আগে জুলাইয়ের শেষ দিকে ওই ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে এনসিপি তানভীরকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছিল। পরে তিনি পোস্টটি সরিয়ে নিয়ে প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেন বলে দলীয় সূত্রে জানানো হয়।
কারাগারের পরিবেশ নিয়েও অভিযোগ
বগুড়া কারাগারে তার থাকার জায়গাটি অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন ছিল বলে দাবি করেন তানভীর। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, বিদ্যুৎ ও পাখার ব্যবস্থা ছিল না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ ছাড়া কারাগারে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি এবং কিছু কারারক্ষীর আচরণ নিয়েও অভিযোগ তোলেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে স্বাধীন তদন্তের ফল বা প্রামাণ্য নথি প্রকাশ করা হয়নি।
পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হুমকির অভিযোগ
তানভীর দাবি করেন, নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বললে তার পরিবারের সদস্যদের জোরপূর্বক গুম করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, এসব হুমকি সত্ত্বেও নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতেই তিনি সংবাদ সম্মেলনে এসেছেন।

0 Comments