আন্তর্জাতিক ও প্রযুক্তি ডেস্ক
সাগরের পানির নিচে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তিতে নতুন মাইলফলক ছুঁয়েছেন চীনের বিজ্ঞানীরা। দক্ষিণ চীন সাগরের উন্মুক্ত পানিতে ১০ মিটার গভীরে সৌর প্যানেল স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সফল হয়েছেন তারা।
গবেষণায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে ব্যাটারি চার্জ করার পাশাপাশি এলইডি আলোও জ্বালানো সম্ভব হয়েছে। ফলে সমুদ্রের পানির নিচে সীমিত পরিমাণ সূর্যালোক ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
পানির নিচে সৌরবিদ্যুৎ, চ্যালেঞ্জ ছিল আলো
গবেষকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল পানির গভীরে সূর্যের আলোর তীব্রতা কমে যাওয়া। গবেষণা অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০ মিটার গভীরে ভূপৃষ্ঠের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ আলো পৌঁছায়।
কম আলো এবং পানির নিচে থাকা সীমিত আলোকবর্ণালির কারণে প্রচলিত সিলিকন সৌরকোষ সেখানে কার্যকরভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না।
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে গবেষকেরা লেড-হ্যালাইড পেরোভস্কাইট দিয়ে তৈরি বিশেষ সৌরকোষ ব্যবহার করেছেন। নীলচে-সবুজ আলোর পরিবেশে এই সৌরকোষ তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।
লবণাক্ত পানি ও পানির চাপেও টেকসই রাখার চেষ্টা
সাগরের পানিতে সৌরকোষের ক্ষয় এবং পানির চাপের কারণে ক্ষতির আশঙ্কা ছিল। এ সমস্যা মোকাবিলায় সৌরকোষে পিএইচএমজি নামের বিশেষ রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে।
এ ছাড়া সৌরকোষের ওপর বিউটাইল রাবার, কাচ ও স্বচ্ছ ইপোক্সি রেজিনের একাধিক সুরক্ষা স্তর দেওয়া হয়। এসব স্তর পানি, চাপ ও ক্ষয় থেকে কোষটিকে সুরক্ষায় সহায়তা করেছে।
১০ মিটার গভীরতায় ৩৪.৭১ শতাংশ দক্ষতা
গবেষকেরা কৃত্রিমভাবে ১০ মিটার গভীর সমুদ্রের আলোক পরিবেশ তৈরি করে পরীক্ষা চালান। সেখানে ছোট আকারের সৌরকোষ ৩৪ দশমিক ৭১ শতাংশ দক্ষতায় আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়। বড় সৌরকোষের দক্ষতা ছিল ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৃত্রিম সমুদ্রের পানিতে ১০ মিটার গভীরে টানা ১ হাজার ঘণ্টা পরীক্ষার পরও সৌরকোষটি তার প্রাথমিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ৯৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১০ মিটার গভীরতার পানির নিচে সৌরকোষটি প্রায় ৫ বছর ৬ মাস কার্যকর থাকতে পারে। এরপরও প্রাথমিক উৎপাদন ক্ষমতার অন্তত ৮০ শতাংশ বজায় রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।
সমুদ্রেও চালানো হয়েছে বাস্তব পরীক্ষা
শুধু গবেষণাগারেই নয়, দক্ষিণ চীন সাগরের ওয়েইঝো দ্বীপের কাছে সমুদ্রেও প্রযুক্তিটির পরীক্ষা চালানো হয়েছে।
একটি পানির নিচের রোবটের সঙ্গে পেরোভস্কাইট সৌরকোষ যুক্ত করে সেটিকে ২, ৬ ও ১০ মিটার গভীরে পাঠানো হয়। সেখানে সৌরকোষ ব্যবহার করে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি চার্জ করা হয়।
দুই ঘণ্টা আলোতে ২ মিটার গভীরে ব্যাটারিতে ১ হাজার ৪১৬ মিলিওয়াট-ঘণ্টা, ৬ মিটারে ৭৫২ মিলিওয়াট-ঘণ্টা এবং ১০ মিটারে ৩২৪ মিলিওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ জমা হয়। সেই বিদ্যুৎ দিয়ে একটি এলইডি প্যানেলও চালানো সম্ভব হয়েছে।
কোথায় কাজে লাগতে পারে এই প্রযুক্তি?
গবেষকদের মতে, পানির নিচে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজন হয় এমন বিভিন্ন প্রযুক্তিতে এই সৌরকোষ ভবিষ্যতে ব্যবহার করা যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
পানির নিচের সেন্সর
ক্যামেরা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা
স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের রোবট
ডুবোজাহাজ ও অন্যান্য সামুদ্রিক যন্ত্র
দীর্ঘমেয়াদি সমুদ্র পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা
গবেষকরা মনে করছেন, পানির নিচে পেরোভস্কাইট সৌরকোষ ব্যবহারের এই সাফল্য ভবিষ্যতে সমুদ্রভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

0 Comments