Header Ads Widget

Responsive Advertisement

দুই দশক পর ইরাক ছাড়ল মার্কিন সেনারা: নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতায় বাগদাদ


মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অবসান, সার্বভৌমত্ব উদ্‌যাপনে ইরাকে চার দিনের সরকারি ছুটি

ডেস্ক রিপোর্ট

দীর্ঘ ২৩ বছরের সামরিক উপস্থিতির পর ইরাক থেকে পুরোপুরি বিদায় নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেন সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান শুরুর মধ্য দিয়ে যে দীর্ঘ সামরিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এসে তার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল।

ইরাকের শেষ মার্কিন সেনারাও দেশটি ছেড়ে যাওয়ার পর বাগদাদ এটিকে জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছে। এ উপলক্ষে দেশজুড়ে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং সরকার চার দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে। তবে মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার পর দেশের নিরাপত্তা কাঠামো, ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব এবং ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সম্ভাব্য পুনরুত্থান নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।

২০০৩ থেকে শুরু, দীর্ঘ সামরিক অধ্যায়ের সমাপ্তি

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু হয়। এর মাধ্যমে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতাচ্যুত হন। পরবর্তী বছরগুলোতে ইরাকে ব্যাপক মার্কিন সামরিক উপস্থিতি তৈরি হয়। ২০০৭ সালে দেশটিতে মার্কিন সেনার সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজারে পৌঁছেছিল।

প্রথম দফায় মার্কিন বাহিনীর বড় অংশ ২০১১ সালে ইরাক থেকে প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের দ্রুত উত্থান ও ইরাকের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখলের পর আবারও মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক উপস্থিতি শুরু হয়। আইএসবিরোধী অভিযানে ইরাকি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহায়তা ও সামরিক সহযোগিতা দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২০২৪ সালের সমঝোতায় চূড়ান্ত প্রত্যাহারের পথ

ইরাক ও যুক্তরাষ্ট্র ২০২৪ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক মিশন শেষ করে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছায়। সে সময় ইরাকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা ছিল। পরবর্তী সময়ে তাদের বড় অংশ সরিয়ে নেওয়া হয় এবং শেষ পর্যায়ে ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলে সীমিতসংখ্যক মার্কিন সেনা অবস্থান করছিল।

শেষ সেনাদের প্রত্যাহারের মাধ্যমে ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলো।

বাগদাদের কাছে নতুন যুগের সূচনা

ইরাক সরকার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে দেশের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশি সামরিক উপস্থিতির অবসান ইরাককে নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করবে।

বাগদাদের জন্য এখন বড় পরীক্ষা হবে—দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী কতটা কার্যকরভাবে সীমান্ত, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। একই সঙ্গে দেশটির বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আনন্দের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে অনেক ইরাকি দীর্ঘদিনের বিদেশি সামরিক উপস্থিতির অবসান হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে সবাই একইভাবে বিষয়টি দেখছেন না।

ইরাকের কিছু নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও স্থানীয় নেতার আশঙ্কা, মার্কিন সামরিক সহায়তা পুরোপুরি সরে যাওয়ার ফলে গোয়েন্দা তথ্য, আকাশ নজরদারি ও সামরিক সহায়তার ক্ষেত্রে একটি ঘাটতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনী এখনো সব ধরনের হুমকি মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ইরানের প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনা

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক প্রভাবগুলোর একটি হতে পারে ইরাকে ইরানের প্রভাবের পরিবর্তন।

ইরাকে ইরান-সমর্থিত একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রভাব রয়েছে। মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এতদিন এসব গোষ্ঠীর প্রভাবের বিপরীতে একটি ভারসাম্য হিসেবে কাজ করেছে বলে কিছু আঞ্চলিক বিশ্লেষকের মত।

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলির মতে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের বিদায়ের ফলে ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর কৌশলগত প্রভাব বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এটি যে নিশ্চিতভাবে ঘটবে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। ইরাকের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আইএসের পুনরুত্থান নিয়েও শঙ্কা

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আরেকটি বড় প্রশ্ন ইসলামিক স্টেট বা আইএসকে ঘিরে।

ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসের তথাকথিত খেলাফত অনেক আগেই সামরিকভাবে পরাজিত হয়েছে। তবে সংগঠনটির কিছু সদস্য ও স্লিপার সেল এখনো সক্রিয় রয়েছে বলে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

মার্কিন গোয়েন্দা সহায়তা, নজরদারি প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতা কমে গেলে আইএসের অবশিষ্ট নেটওয়ার্কগুলো নতুন সুযোগ পেতে পারে—এমন আশঙ্কা কয়েকজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী নিজেদের সক্ষমতা দিয়ে এই হুমকি মোকাবিলা করতে পারবে কি না, সেটিও আগামী দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

ওয়াশিংটন-বাগদাদ সম্পর্ক কি শেষ হচ্ছে?

মার্কিন সেনা প্রত্যাহার মানেই ইরাক ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের সম্পূর্ণ অবসান নয়।

সামরিক উপস্থিতি শেষ হলেও দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত থাকার সুযোগ রয়েছে। বরং সামরিক জোটের পরিবর্তে ভবিষ্যতে সম্পর্কটি আরও বেশি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা ও ইরাকি নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে যেতে পারে।

এ কারণে বর্তমান ঘটনাকে শুধু ‘মার্কিন বিদায়’ হিসেবে দেখলে ইরাকের ভবিষ্যৎ বাস্তবতার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।

Post a Comment

0 Comments