ঢাকা | ডেস্ক রিপোর্ট
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ৫ লাখ ডেঙ্গু টেস্ট কিট দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব কিট দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে পর্যায়ক্রমে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতালে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া NS1 Rapid Diagnostic Test (RDT) Kit হস্তান্তর ও গ্রহণ অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানান তিনি। অনুষ্ঠানের পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী কুর্মিটোলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, ডেঙ্গু ওয়ার্ড এবং রোগ নির্ণয় পরীক্ষাগার পরিদর্শন করেন।
৫ লাখ কিট যাবে জেলা-উপজেলায়
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ৫ লাখ টেস্ট কিট দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিতরণ করা হবে। এর ফলে রাজধানীকেন্দ্রিক পরীক্ষার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু শনাক্তকরণের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষ করে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে পরীক্ষার উপকরণ সহজলভ্য থাকলে রোগীকে পরীক্ষা করানোর জন্য দূরের বড় হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজনও কিছুটা কমতে পারে।
দেশে টেস্ট কিটের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুত রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সহায়তা সেই প্রস্তুতিকে আরও সম্প্রসারিত করতে সহায়ক হবে।
তবে শুধু পরীক্ষার কিট মজুদ থাকাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নয়। রোগ শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসা, পর্যাপ্ত হাসপাতাল শয্যা, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক-নার্স, প্রয়োজনীয় স্যালাইন ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং রোগীর পর্যবেক্ষণ—সবগুলো ব্যবস্থাই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গু পরীক্ষায় সরকারি প্রস্তুতি
এর আগে জুলাইয়ে সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সরকারি হাসপাতালে NS1 পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে IgG ও IgM পরীক্ষার ফি কমিয়ে ৫০ টাকা করার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। তখন কেন্দ্রীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক RDT কিট মজুদের কথাও বলা হয় এবং আরও ৫ লাখ কিট যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল।
সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষার খরচ কমিয়ে আনার উদ্যোগের লক্ষ্য হলো ডেঙ্গু সন্দেহ হলে দ্রুত পরীক্ষা করানোর সুযোগ বাড়ানো। কারণ ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক শনাক্তকরণ রোগীর চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বেসরকারি হাসপাতাল নিয়েও প্রস্তুতি
ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখার বিষয়েও সরকার আগে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছে।
জুলাইয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে মোট শয্যার ১০ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীদের জন্য প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি নির্ধারিত হারে ডেঙ্গু পরীক্ষা করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
এর আগে জুনে বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার খরচ কমানো এবং ভর্তি রোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ ফি না নেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনার কথাও জানানো হয়েছিল।
আগের বছরের তুলনায় পরিস্থিতি নিয়ে কী বলা হয়েছিল?
জুলাইয়ে সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে ৮ হাজার ৯৭৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত এবং ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। একই সময়ে ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ২১০ এবং মৃত্যু হয়েছিল ৫৮ জনের বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন।
তবে ডেঙ্গুর প্রকোপ মৌসুমভেদে দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে বছরের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যান দিয়ে পুরো বছরের পরিস্থিতি নির্ধারণ করা যায় না। বরং পরবর্তী মাসগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা, হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর প্রবণতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
শুধু চিকিৎসা নয়, মশার প্রজননস্থল ধ্বংসও গুরুত্বপূর্ণ
ডেঙ্গু মোকাবিলায় রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার পাশাপাশি Aedes মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়।
জুলাইয়ের বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং মশা ও লার্ভা ধ্বংসের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
অর্থাৎ ডেঙ্গু মোকাবিলার কার্যক্রমকে মোটামুটি তিনটি স্তরে দেখা যায়—
প্রথমত, দ্রুত শনাক্তকরণ;
দ্বিতীয়ত, আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা;
তৃতীয়ত, মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ।
এই তিনটির মধ্যে সমন্বয় না থাকলে শুধু টেস্ট কিট বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।

0 Comments